ভরত-ভায়নার দেউল ও কিছু কথা

দেউল শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘মন্দির’ বা দেবালয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ৯নং গৌরিঘোনা অঞ্চলের পূর্ব-দক্ষিণ সীমান্তে ভরত-ভায়না গ্রামে এই দেউলটি অবস্থিত। কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার। দেউলটি প্রায় ৫০ ফুট উঁচু ও পরিধি প্রায় ৯৪০ ফুটের অধিক বিস্তৃৃত। গৌরিঘোনার ভূমি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় হরিহর ও ভদ্রা নদীর পলি দ্বারা। এই দেউলের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ২ কিলোমিটারের মধ্যে গৌরিঘোনার কথিত ভরত রাজার বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। এই রাজবাড়ীর দক্ষিণে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে কাসিমপুর গ্রামে ২০ ফুট উঁচু ও ১ একর জমিতে বিস্তৃত (ডালিঝাড়া) ভরত-ভায়নার দেউলের আদলে অপেক্ষাকৃত ছোট আরও একটি স্থাপনার অবস্থান। দুটি স্থাপনারই আকৃতি ও প্রকৃতিগত দিক প্রায় অভিন্ন। উভয় স্থাপনায় ব্যবহৃত ইট ও গঠন কৌশল দেখে মনে হয় স্থাপনাদ্বয় একই কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ভরত-ভায়নার দেউলটি আসলে কি? কে বা কারা এর প্রতিষ্ঠাতা? এটা কেনইবা নির্মিত হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ৪টি মতামতের সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা আলোচনা ও পর্যালোচনা করে সঠিক তথ্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। এলাকায় সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে যে চারটি মতামত জানা যায় সেগুলো নিচে উপস্থাপন করছি।

প্রথমত, কোন এক বিশেষ ব্যক্তি ঐ দেউলের চূড়ায় মাতৃমূর্তি স্থাপন করে সেই মাতৃমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মা তোমার মাতৃ দুগ্ধের ঋণ শোধ করলাম’। একথা বলার সাথে সাথে উক্ত মাতৃমূর্তি হুমড়ি খেয়ে পড়ে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। এমন একটি কিংবদন্তীর কতটুকু সত্যতা আছে? যদি বিষয়টি সত্য হতো তবে কিংবদন্তী আকারে হলেও জানা যেত কে সেই বিশেষ ব্যক্তি। আর তিনি যে মূর্তি গড়েছিলেন তা কি তার নিজের গর্ভধারিণী মা না কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পূজিত কোন মাতৃমূর্তি। সম্প্রদায়গত মাতৃমূর্তি হলে আজও সেই দেবীমূর্তির পূজা কোন না কোন ভাবে পূজিত হত। আর গর্ভধারিণী মায়ের মূর্তি হলে বিশেষ সেই ব্যক্তির পরিচয় মুখে মুখে ফিরত। এ দুটি বিষয়ের কোনটিই যখন স্পষ্ট হয়নি তখন বুঝতে হবে কাহিনীটি নিছক কল্প কাহিনী মাত্র।

                      দেউলের উপর বন্ধুদের সহ লেখক

দ্বিতীয়ত, এই দেউলটি বৌদ্ধদের বিহার বা সঙ্ঘারাম। অধ্যাপক মতিউর রহমান তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থে ৯ পাতায় বলেছেন “ইংরেজী দুশো শতাব্দীতে গুপ্ত যুগে ভরত রাজা এটা নির্মাণ করেন বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। এর গঠনশৈলী প্রমাণ করে যে, এটা একটি বৌদ্ধ মঠ। প্রখ্যাত পর্যটক হিউয়েন সাং এর বর্ণনা অনুযায়ী সমতট অঞ্চলের ত্রিশটা বৌদ্ধ সঙ্ঘারামের একটি”। জনাব মতিউর রহমান পরে “ভদ্রা” পত্রিকায় ৪ ও ৫ নং পাতায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক প্রাচীন যুগে বাংলায় হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি জৈন ধর্মের জনপ্রিয়তা ছিল। শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র ভরত-ভায়না দেউলকে বৌদ্ধ স্থাপনা বলেছেন। তিনি তার যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন, হিন্দু ও পরবর্তীতে মুসলিম শাসনের পূর্বে এ অঞ্চলে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের আবাসস্থল ছিল। তার যুক্তির পক্ষে তিনি বরাতিয়ার বৌদ্ধ মঠের কথা উল্লেখ করেছেন। তার এই যুক্তি কিছুটা গ্রহণযোগ্য হলেও পুরোপুরি সত্য নয়। বরাতিয়া বৌদ্ধ মঠের সন্নিকটে ভরত-ভায়না দেউল বৌদ্ধ বিহার বা সঙ্ঘারামের দাবীটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া খনন কার্যের পর এখানে বৌদ্ধ মঠের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এরপর কুমিল্লায় শালবন বিহারসহ অন্যান্য বিহারের সংগে এর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া ভরত-ভায়নার দেউল বৌদ্ধ বিহার হলে কাসিমপুরের ডালিঝাড়াটি তাহলে কি? এসব প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় এটা বৌদ্ধবিহার নয়।

তৃতীয়ত, অধ্যাপক মতিউর রহমান সাহেব ভদ্রা পত্রিকায় হিউয়েন সাঙ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, দক্ষিণ বঙ্গে (সমতট) ও উত্তর বঙ্গে পন্ডুবর্ধনে জৈন ধর্মের প্রভাব ছিলো। সম্রাট অশোকের পিতা জৈন ধর্মের অনুসারী ও খনন কার্যে আবিষ্কৃত পোড়ামাটির ফলকের সাথে প্রত্নতত্ত্ব দফতরের খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক শিহাব উদ্দীন মোঃ আকবর ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গবেষকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ঐ দেউলকে জৈন স্থাপনা বলে জোর দিয়েছেন। তবে আমার জানা মতে তার দেওয়া তত্ত্বগুলিতে সুনির্দিষ্ট কোন গ্রন্থের উল্লেখ নেই। ড. কিরণ চন্দ্র চৌধুরীর রচিত “ভারতের ইতিহাস কথা” গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যায় পার্শ্বনাথ জৈন ধর্মের প্রবর্তক হলেও মহাবীরের সময় এই ধর্ম প্রসার লাভ করে। মগধ, অঙ্গ, মিথিলা, কৌশল, গুজরাট, রাজপুতনায় জৈন ধর্ম বিস্তার লাভ করে। জৈন ধর্ম ভারতের বাইরে বিস্তার লাভ করেনি। উত্তর বিহার থেকে এর উৎপত্তি হয়ে দক্ষিণ বিহার (বর্তমান নাম ঝাড়খন্ড) হয়ে দক্ষিণ ভারত ও পশ্চিম ভারতে কিছু কিছু এলাকায় বিস্তার লাভ করে। ভরত-ভায়নার দেউলে ও পুকুরে প্রাপ্ত পোড়া মাটির ফলক থেকে প্রমাণিত হয় না সেটা জৈন স্থাপনা। হরপ্পা ও ময়েঞ্জোদাড়ো খননের পর এই জাতীয় বহু ফলক আবিষ্কৃত হয়েছিল। এরপরও বলা যায় বাংলাদেশে কোথাও জৈন স্থাপনার কোন নজির নিশ্চিত ভাবে পাওয়া যায়নি। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি জৈন ধর্মের প্রচার থাকলে তার নিশ্চিত নিদর্শণ কোথাও না কোথাও মিলত। তাই এই স্থাপনাকে জৈন স্থাপনা বললে কাসিমপুরের ডালিঝাড়াকে কোন স্থাপনা বলবেন বিষয়টি ভাববার দাবী রাখে। কাসিমপুরের স্থাপনাকে কেউ কেউ ভরত রাজার কোন উচ্চ পদস্থ কর্মচারীর আবাসস্থল বলেছেন।

চতুর্থত, উপরে উল্লেখিত হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপনার পাশাপাশি আর একটা মত প্রচলিত আছে ঐ দেউল সম্পর্কে। তাদের মত হল নদীমাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ছিল দুর্গম। এখানকার চলাচলের একমাত্র ও সহজসাধ্য মাধ্যমই নদীপথ। আর এই নৌপথ ছিল জলদস্যুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। দস্যু তস্করদের উপদ্রবের ভয়ে এখানকার সাধারণ মানুষ থেকে শাসক শ্রেণী সবসময় সন্ত্রস্ত থাকত। গৌরিঘোনায় তথা কথিত ভরত রাজার রাজ্যের জনপদ তথা রাজবাড়ী রক্ষার জন্য পূর্বে হরিহর ও ভদ্রার সংযোগ স্থলের পাশেই একটি সেনাচৌকি স্থাপন করেন। এর উপরের স্থাপনা ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এটা একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সে সময় ভদ্রা ও হরিহরনদীর নাব্যতা ও খরস্রোত থাকায় সন্নিকটস্থ টাওয়ারটি ঝুঁকির মধ্যে ছিল। ভরত রাজার রাজ্য আক্রান্ত হওয়ার যতটুকু সম্ভাবনা ছিল তার দুই-তৃতীয়াংশ সম্ভাবনা ছিল এই পথে। একারণে রাজা রাজ্যের তথা রাজবাড়ীর সুরক্ষার জন্য এখানে একটি বড় সেনাচৌকি স্থাপন করেন। একই চিন্তা ধারায় অরক্ষিত দক্ষিণ দিক রক্ষার জন্য এই দেউলের অনুকরণে কাসিমপুরে আরও একটি অপেক্ষাকৃত ছোট সেনাচৌকি স্থাপন করেন। এই দুই সেনাচৌকির মাধ্যমে এখানকার কথিত ভরত রাজা নিশ্চিন্তে তার শাসন কার্য পরিচালনা করতেন। এখানকার কথিত রাজা (ভরত রাজা) তেমন কোন বড় মাপের নৃপতি ছিলেন না। তিনি হয়তো কোন বড় ও প্রভাবশালী রাজার অধীনে আঞ্চলিক শাসক ছিলেন।  

এই দেউলের সাথে বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। অনুমান করা যায় মহাস্থানগড়ের তৎকালীন শাসকের সংগে ভরত রাজার সখ্যতা ছিল। এরপরও বিষয়টি আরও গবেষণার দাবী রাখে। এ বিষয়ে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সত্য উৎঘাটনে সহায়তা করলে আমরা সবাই উপকৃত হব। পাশাপাশি আগামীতে এর বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে সত্য উৎঘাটনে সচেষ্ট থাকব।

লেখক পরিচিতিঃ

মোঃ রুহুল আমিন

অধ্যক্ষ, পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ, ডাকঘরঃ পাঁজিয়া, উপজেলাঃ কেশবপুর, জেলাঃ যশোর।
সাংবাদিক ও কলামমিস্ট।
মোবাঃ ০১৭১৮-৬১১৫৫০, ই-মেইলঃ  ruhulamin0655@gmail.com

তথ্য সূত্রঃ

=> ড. কিরণ চন্দ্র চৌধুরী – ভারতের ইতিহাস কথা।
=> সতীশচন্দ্র মিত্র – যশোর খুলনার ইতিহাস।
=> মোঃ মতিয়ার রহমান – ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
=> মোঃ মতিয়ার রহমান সম্পাদিত ভদ্রা।

You May Also Like