বাংলা সাহিত্যে একুশ

অধ্যক্ষ রুহুল আমিন ||

বাঙলী, বাংলা ভাষা ও একুশে ফেব্রুয়ারী এই তিনটি কথা এক সুতোয় বাঁধা। এর যে কোন একটি ধরে টানলে অন্য দুটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এসে যায়। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের জনক মি: জিন্নাহর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা “Urdu and Urdu shall be state Language of Pakistan”-  থেকে যে ধুমায়িত অগ্নির সূত্রপাত, ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণায় সে অগ্নি লেলিহান শিখার রূপ নেয় এবং একই সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী সে লেলিহান শিখার সর্বনাশা রূপ ভাষা শহীদের আত্মদানের ইতিহাস সৃষ্টি করে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার অনন্য নজির স্থাপন করল ভাষা শহীদরা। সেদিন থেকে বাঙ্গালীর সামাজিক, রাজনৈতিক, সাহিত্য, সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রেই একুশ স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
 
ভাষা আন্দোলন বা একুশে ফেব্রুয়ারী বাঙালি জীবনে এক বিশেষিত অধ্যায়। তার তুলনা কেবল সে নিজে। এই দিনটি আমাদেরকে ক্রমাগত জানিয়ে দেয় সুদূর অতীতে আমাদের জন্মবৃত্তান্ত, সামাজিক, সংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও গণতান্ত্রিকতার পরিচয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার জন্য দেশ প্রেমিক ছাত্র সমাজ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ঢাকার রাজ পথ রাঙ্গিয়ে দিয়েছিল তারই করুণ আলেখ্য একুশে ফেব্রুয়ারী। যদিও আমাদের ক্ষোভ জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে ধূমায়িত হয়েছিল, তবুও তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষা আন্দোলনকে উপলক্ষ্য করে। ভাষা যেহেতু সাহিত্যের বাহন, সেহেতু একুশে ফেব্রুয়ারীর অন্তর্গত চেতনা। সেদিনের গুলির শব্দের প্রায় পরপরই কবিতায় ছড়িয়ে পড়ে স্মরণীয় একুশে কেন্দ্রীক প্রথম সাহিত্য কর্ম মাবুবুল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসেনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ রচিত হয়েছিল একুশের গুলি বর্ষণের পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্য। কবিতাটি লিপিবদ্ধ হওয়ার পর আর দ্বিতীয় বার প্রকাশিত হয়নি। কবিতাটি কিছু অংশ এরকম।

“এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার উর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার নীচে
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে আলপনা
সেখানে আমি কাঁদতে আসেনি
আজ আমি শোক বিহ্বল নই,
আজ আমি রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত।
…  …  …  …  …  …
“আমার এই সব ভাইদের যারা হত্যা করেছে
আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি”

বিমূর্ত ভাব প্রকাশের এমন অপরূপ সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে পায়নি। এক মুহূর্তেই একটি দিন আমাদের জাতির একটি ঐতিহ্যে পরিণত হল। প্রথম একুশে সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। জীবন শিল্পের স্বাক্ষর আমাদের আবিষ্কারের প্রথম দলিল। সে দিন তরুণ ছাত্র-ছাত্রী যারা তাদের লেখা গল্প কবিতার অঙ্গনে মুক্তির বাণী জানিয়ে আহবান করেছিল দ্বৈরথ সমরে অবতীর্ণ হতে। আমাদের পূর্বসূরী যারা ছিলেন শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে, তাঁরা উঠে এলেন একই বেদনায় সমতলে আমাদের দুঃখের কাছে। আমাদের অহংকারের সামনে সংকুচিত হল প্রবলের স্পর্ধায় অতিকায় চেহারাটা। এই সংকলনটিও প্রকাশিত হওয়ার পর নিষিদ্ধ হয়েছিল। ঐ সংকলনে যাদের কবিতা ছিল তারা হলেন- কবি শামসুর রাহমান, বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, আব্দুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আতাউর রহমান, ডঃ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সিকান্দার-আবু-জাফর, মাহবুব তালুকদার, আল মাহমুদ, বেগম সুফিয়া কামাল, হাসান হাফিজুর রহমান। ভাষা আন্দোলনে শহীদের নাম যিনি কবিতায় প্রথম উচ্চারণ করেন তিনি কবি হাসান হাফিজুর রহমান। সে দিন লেখা হয়েছিল-

আবুল বরকত নেই, সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা
বিশাল শরীর বালক, মধু ষ্টলের ছাদ দুলে হাটতো যে
তাকে ডেকোনা……………..
সালাম, রফিক উদ্দিন, জব্বার কি বিষম থোকা থোকা নাম
এই এক সারি নাম বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার মতো এখন হৃদয়ে কেবল
……………. আবুল বরকত, সালাম, রফিক উদ্দিন, জব্বার
কি আশ্চর্য্য কি বিষম নাম একসারি জলন্ত নাম।”

মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান তার কবিতায় ভাষা শহীদের সম্পর্কে বললেন-
“এ দেশের প্রবাসী
নয় তারা হতে চেয়েছিল
এ দেশে ঘাসের শরীর”

-এ পংক্তির মধ্যে সেদিন পাকিস্তানী শাসকেরা এ দেশের মানুষকে কি চোখে দেখতো তার পরিচয় পাওয়া যায় এবং সেই বোধ একমাত্র কবিদের হৃদয়ে সর্বপ্রথম জন্ম নেয়। স্মৃতি মিনার ভেঙ্গে দেওয়ার উপর লেখা আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতি স্তম্ভ’ ইটের মিনার ভেঙ্গেছে কবিতায় অপরাজেয় জনতা উঠে এসেছে-

স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছিতো যে ভিত কখনো কোন রাজন্য
পারেনি ভাঙ্গতে
ইটের মিনার ভেঙ্গেছে ভাঙ্গুক, একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি পরিবার
বেহালার সুরে রাঙ্গা হৃদয়ের বর্ণ লেখায়’।

কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে বাঙালীর অন্তরের শহীদ মিনার হল আরো মজবুত। বাংলা কথা সাহিত্যে একুশ নির্ভর প্রথম উপন্যাস আমরা পায় ঘটনার সতের বছর পর। সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা ছোট গল্পে। একুশের প্রথম গল্প শওকাত ওসমানের ‘মৌন নয়’। একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়ে সিরাজুল ইসলামের গল্প ‘লালফুল’ সাইয়িদ আতিকুল্লাহর ‘হাসি’ আনিসুজ্জানের ‘দৃষ্টি’। একুশের প্রস্তুতিতে মুখর গভীর ভাষাপ্রীতিতে প্রবল দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত পরিশেষে দমন নীতির মোকাবেলায় রক্তস্নাত শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘এমন করেই গড়ে উঠবে’ নামে একটি গল্প। এক আকস্মিক পরিকল্পণায় বিপুল জনতা প্রতিম ছাত্র ও ছাত্রীদলের হাতে রাতারাতি প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ রচনাটির বিষয়। জহির রায়হানের একুশ ভিত্তিক গল্প ‘সূর্য গ্রহণ’ ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কাহিনী তার মহামৃত্যু গল্প অবলম্বনে একজন শহীদ, যার লাশ তার মহল্লায় নিতে হলে সারা মহল্লা শোকাহত হয়ে শ্রদ্ধায় ভীড় করে। সেলিনা হোসনের ‘দীপাম্বিতা’ গল্পের নবীন প্রবীনের দ্বন্ধ পিতায় এবং পুত্রে। একদিকে পুত্র একুশে  ফেব্রুয়ারীর মিছিলে যাওয়ার জন্য বন্ধপরিকর অন্যদিকে দায়িত্ববান পুলিশ অফিসার পিতা তাকে বাঁধাদিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত জয় হয় পুত্রের। মিছিলের উদ্দেশ্যে গুলি চালাতে গিয়ে পিতা তার রাইফেল নামিয়ে নেন। একুশের মর্মবাণীর ক্রমবর্ধমান জোয়ারে নিষ্ঠাবান সেই পুলিশের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। এছাড়া আরও অনেক গল্পকার একুশ ভিত্তিক গল্প লিখেছেন। একুশ প্রধানত একগুচ্ছ চেতনার সৃষ্টি। আর এই চেতনার প্রতিফলন আমাদের উপন্যাস সাহিত্যেও লক্ষণীয়। ১৯৫৪ সালে রচিত রাবেয়া খাতুনের ‘রাজারবাগ শালিমার বাগ’ ফেব্রুয়ারীর আদিতম উপন্যাসগুলির একটি। তবে একুশের চেতনা উপন্যাসে খুব গভীর ভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

দিলারা হাসেমের ‘ঘর মন জানালা’ আব্দার রশিদের ‘লঘুমেঘ’ উপন্যাসে একুশের কিছু স্পর্শ আছে। জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্লুন’ একুশ ভিত্তিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের বিষয় ১৯৫৫ সালের একুশ বার্ষিকী কুশীলব প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের ছাত্র এবং ছাত্রীদল। সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ উপন্যাসে ভাষা-আন্দোলনের উল্লেখ একাধিক জায়গায় আছে, কিন্তু সর্বত্র সবিস্তারে নয়। সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসে একুশ প্রসঙ্গ এত প্রবল এবং এত ব্যাপক যে, আর একটু হলেই একে বলা যেত সম্পূর্ণ একুশ নির্ভর। এটি কেবল উপন্যাস নয় ভাষা আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দলিল।
 
আমাদের নাট্য সাহিত্যে উদারতার প্রাণের উত্তাপ সঞ্চারিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের পটভূমি থেকেই। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি রচিত হওয়ার পূর্বে গর্ব করার মত তেমন কোন নাটক আমাদের ছিলনা। আর তাই বাংলাদেশের নাট্য সাহিত্যের প্রাথমিক পর্বের নাটক আলোচনা করতে গেলে বারবার আমাদের অসহায় ভাবে ফিরে যেতে হয় নুরুল মোমেনের নেমেসিস নাটকের কাছে। যে ন্যায় অন্যায়ের সরলীকৃত ছন্দের আবেগ সঞ্চিতার মধ্য এ নাটকের ট্রাজেডিকে ঘনীভূত করা হয়েছে। বাংলা নাট্য সাহিত্যে তা বহু ব্যবহৃত উপাদান। এই ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে নুরুল মোমেন সংযোজিত করতে পেরেছিলেন তার নিজস্ব রসবোধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ। এ রসবোধের নিজস্বতায় তাকে পরবর্তীতে নিয়ে গেছে কমেডি সৃষ্টির প্রেরণাতে ‘রুপান্তর’ ও ‘আলোছায়াতে’ রয়েছে যার স্বাক্ষর। কিন্তু সমগ্র বাংলা নাট্য সাহিত্যের পরিসরে এবং কোনটিই উজ্জ্বল সৃষ্টি নয়।
    
সে সময় আমাদের নাট্য সাহিত্যের দীনতা ঘোচাবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন শওকত ওসমান। তার নাটক সর্বদাই একটা নিটোল বক্তব্যকে ধারণ করেও কোথাও হয়ে পড়েছে স্বেচ্ছাধর্মী, আবার কোথাও প্রহসন ধর্মীতা সর্বদা বসবাস করেছে কমেডির রাজত্বে, ট্রাজেডির অশ্রুময়তায় আকৃষ্ট হয়নি। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিকে যে সামাজিক মানসিক ব্যধিগুলো আমাদের জীবনের স্বাভাবিক সুস্থতাকে বিব্রত ও বিঘ্নিত করার জন্য যেটা জেঁকে বসেছিল নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্মম নিলিপ্ততায় শওকত ওসমান তার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন ‘কাঁকরমনি’ নাটকে। আমলার মামলা নাটকে আমরা দেখি এক শ্রেণীর প্রতিনিধি চরিত্র। যারা সর্বদাই শাসনের সেবাদাস। এ চরিত্রগুলোকে আমরা শওকত ওসমানের নাটকে উজ্জ্বল ভাবেই দেখেছি। এ সময় প্রচুর নাটক লিখেছেন আশকার-ইবনে-শাইখ। দুইহাতে তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন আমাদের জীবনের দুই ভিন্নকালীন অবস্থানকে। যার একদিকে রয়েছে অতীত আর একদিকে রয়েছে বর্তমান।  নবোদ্ভূত পাকিস্তানের অধিবাসীদের ঐতিহ্যের উৎস, সে অধ্যায়কে চিহ্নিত করার একটা সচেতন প্রয়াস অনেকের মধ্যেই কার্যকর ছিল সন্দেহ নেই। আশকার-ইবনে-শাইখ তার দ্বারা আলোড়িত হয়েছিলেন, তবে তার কৃতিত্ব এখানেই যে, সেই মৃত অধ্যায়ের কুহক তার সমগ্র জীবনের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি সমান সপ্রতিভতায়। তিনি হেঁটে বেড়িয়েছেন সমকালের রুক্ষ মাটিতেও। তার নাটকগুলো হল-পদক্ষেপ, অনুবর্তন ও দুর্যোগ’। তবে ভাষা আন্দোলনের মত আমাদের অস্তিত্বের মর্মমূল পর্যন্ত আলোড়িত করার বিষয় নিয়ে লেখা মহান নাটকের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে  মুনীর চৌধুরীর জন্য।
 
১৯৫০ সালে প্রকাশিত মুস্তফা নরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘দাঙ্গার পাঁচটি গল্প’ আমরা পেয়েছিলাম। মুনীর চৌধুরীর একটি একাঙ্কিকা নাটক ‘মানুষ’। এখানে আমরা দেখেছি এক উদার অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী মুনীর চৌধুরীকে। যিনি জাতি ধর্ম-বর্ণ ভাষার উর্ধ্বে স্থাপন করতে প্রত্যয়ী মানব ধর্মকে। সেই প্রকৃত জীবনবাদী ও সংঘাত বিরোধী মানসিকতাকে ইতিহাসের বিস্তৃত করতলে ব্যঙ্গময় হতে দেখেছি তার ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকে। তার অনেক আগেই ভাষা আন্দোলনকে  ঘিরে আপতিত মৃত্যু, রক্তপাত, মৃত্যু আর পিড়ন সঙ্গত কারণেই তাকে ব্যতিত ও বিক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল। আর তার ফলশ্রুতিতেই কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন তিনি। সেই কারাগারে বসেই লিখলেন বাঙ্গালীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা নিংড়ে নেওয়া নাটক ‘কবর’। একুশে ফেব্রুয়ারী বা ভাষা আন্দোলন তার অনিঃশেষ তেজ আর অপরিমেয় ত্যাগের নিরিখে অমরত্ব পেল ঐ নাটকটিতে। আমরা আবার বিস্ময়ে দেখলাম  আমাদের সেই অকুতোষয় ও মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের। যাদের গুলি হত্যা করা যায়; কিন্তু নিবৃত্ত করা যায় না সংকল্প থেকে পাশাপাশি দেখলাম গণবিরোধী শাসকের আতঙ্কিত মুখও। মুনির চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ এবং ‘কবর’ নাটকের রক্ত আর মৃত্যুর পটভূমিতে দাঁড়িয়ে গাঢ় বেদনার পাঠক ও দর্শকের অভিভূত করে ফেললেও ‘দন্ডকারণ্য’ এবং ‘চিঠি’ নাটকের উম্মোচন করেছেন ভিন্নতর পরিপ্রেক্ষিত। এখানে অশ্রুর  আলপনা, হাঁসির তীব্র ছটা ভাসিয়ে দেয় সবকিছু। তার সমসাময়িক কালে রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাবোধ সম্পন্ন নাট্যকারদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য হলেন সিকান্দার-আবু জাফর ও আলাউদ্দিন-আল-আজাদ। শক্তিমান কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ উপহার দিলেন নাটক ‘বহিপীর’। তিনি তার নাটককে দেশীয় পরিশ্রেক্ষিতের সাথে ইউরোপীয় অধিবাস্তবাদী করার চেষ্টা করেন। এতে তিনি মূখ্যকরে তুলতে চেয়েছিলেন মানবিক আদর্শ ও সমাজ মানুষের দুই বিপরীত চেতনার দ্বন্দ্ব। অবক্ষয়িত সামান্ত চেতনার গর্ব থেকে নিয়ে এসে যে মূল্যবোধগুলো অঙ্কত রসতন্ত্রের মধ্যে সম্মুখ চলার পথ খুঁজে হোঁছট খাচ্ছিল অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ওয়ালিউল্লাহ এ নাটকে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার ‘তরঙ্গ ভঙ্গ’ সময়ের সম্মুখ চলার সাথে জীবনকে প্রগাঢ় ভাবে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছেন, ফলে আঙ্গিকের পাশাপাশি বিষয়বস্তুতেও এসেছে বৈচিত্র্য। যা আমাদের নিয়ে যায় এক জটিল জীবন ভাবনায় আবর্তে। তার ‘উজানে মৃত্যু’ নাটকে তিনটি প্রতীকি চরিত্রের মাধ্যমে নৈরাশ্য, নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর অনুষঙ্গের আধুনিক জীবনের এক ক্লান্ত ও ধূসর পরিচয় অভিব্যক্ত হয়েছে। একুশ ভিত্তিক প্রবন্ধ সাহিত্য রচনায় বদরুদ্দিন ওমর, আহম্মদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আহম্মদ মাহফুজুল্লাহ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রভাব বাঙ্গালীদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিক জীবনের এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে, সাহিত্যের সর্বত্র তার ছাপ সুস্পষ্ট। বাঙ্গালীয়ানার ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে চাপা ছিল বলে আমরা পিছিয়ে ছিলাম অনেক ব্যাপারে। একুশের চেতনা আমাদের ভিতরে জাগিয়েছে জাতীয়তাবোধ; স্বাধীকার চেতনা ও আত্মবিশ্বাস। সম্প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারীর চেতনা আমাদের জাতীয় অঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন সারা পৃথিবী আমাদের ভাষা ও শহীদ দিবস তথা একুশে ফেব্রুয়ারী কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করে ও করবে। তাই এর ঢেউ বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন মাত্রা যোগ করবে, খুলে যাবে বিশ্ব সাহিত্যের ক্ষেত্রে একুশের চেতনার উৎসমূখ। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।      
 

লেখক পরিচিতিঃ

মোঃ রুহুল আমিন

অধ্যক্ষ, পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ

ডাকঘরঃ পাঁজিয়া, উপজেলাঃ কেশবপুর, জেলাঃ যশোর।
সাংবাদিক ও কলামমিস্ট।
মোবাঃ ০১৭১৮-৬১১৫৫০, ই-মেইলঃ  ruhulamin0655@gmail.com

You May Also Like