বৈষম্য যখন জগদ্দল পাথর

১.

কলেজের সামনের হোটেলে ডুকলাম হালকা নাস্তা করার জন্য। দোকানদারকে (৩৫), ” ভাই, আমাকে ৩টা পুরি আর ২টা সিঙ্গারা দিন।” বসে আছি ১০ মিনিট যাবৎ। দেরি হচ্ছে একটু ভীড় বলে। হঠাৎ ১ম বর্ষের এক ছেলে ডুকেই দোকানদারকে বলল,”এ মামা, ২টা পুরি আর সিগারেট দে তো।” দোকানদার আমার খাবার দেওয়া রেখে ঐ ছেলেকে আগে দিল। এ সকল দোকানদাররা জানে কোন  কাস্টমারকে আগে দিতে হবে আর কোন কাস্টমারকে একটু দেরিতেও দিলে তারা প্রতিবাদ করবে না। বুঝলাম, “মামা” আর “ভাই” বলে সম্বোধনের পার্থক্য। আমরা কোন বড়লোক ব্যক্তিকে “মামা” বলে ডাকতে পারি না, কিন্তু নিম্ন শ্রেণির বা পেশার মানুষকে হর-হামেশা বলতে পারি।

গরীব বা হোটেলে কাজ করা ছোট ছেলেটাকে কথায় কথায় ধমক বা গায়ে হাতও উঠাতে পারি। কিন্তু যে ছেলের ঘরে সুন্দরী বোন আছে তাকে পারি না। তাকে আমরা চকলেট কিংবা আইসক্রিম খেতে না চায়লেও কিনে দিতে পারি, কিন্তু পথ শিশুকে ২ টাকার রুটি কিনে দিতে গেলেই আমাদের টাকা ফুরিয়ে যায়।

২.

দূর্গা পূজার সময়। রাত প্রায় ১০ টা বাজে তখন। মঙ্গলকোট বাজারে ঢাকায় থাকা এক বড় ভাইয়ের সাথে অনেক দিন পরে দেখা হওয়ায় কথা বলছি। এমন সময় পাশে হঠাৎ করে দেখলাম মারামারি হচ্ছে। জুতা সেলাই করে ঋষি সম্প্রদায়ের যে ছেলেটা (২২), তাকে মেরেছে মুসলিম এক লোক (৪০)। ছেলেটির অপরাধ লোকটি তাকে জুতা সেলাই করতে বলায় সে রাজি হয় নি। ছেলেটির এলাকার মন্দিরে পূজার অনুষ্ঠানে যাবে বলে। কিন্তু ও লোকটার কথা, “সে কেন তার কাজ না করে যাবে? ” এর ফলে মারামারি। লোকটি ছেলেটিকে জাত তুলে অত্যন্ত অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। এ রকম ঘটনা আমরা গরীব নিম্ন পেশার ও শ্রেণির মানুষগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত করে চলেছি। এ কারণে এখনও পত্রিকার পাতায় খবর হয় কেশবপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাজারে ঋষি সম্প্রদায়দের চা খেতে দেওয়া হয় না। একজন দোকানদারকে আমি টাকা দেয়, সে আমাকে বিনিময়ে পণ্য দেয়। গাড়ির
কন্টেকটার / হেলপার টাকার বিনিময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। চর্মকার টাকার বিনিময়ে যেমন আমার জুতা সেলাই করে আমিও কোন প্রতিষ্ঠানে কাজের (চাকুরী) মাধ্যমে মাস শেষে টাকা পায়। বিষয়গুলো একই, অর্থের বিনিময়ে কাজ। কিন্তু এখানে মানুষ হিসেবে একজন আরেক জনকে কেন আমরা ছোট করে দেখব। আর কেন তার সাথে পশুর মত আচরণ করব? সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তো কখন গরীব, নিচু পেশার, জাতির বা ধর্মের মানুষের সাথে কখন রূঢ় আচরণ করেছিলেন বলে তো শুনি নি! বরং তার চারিত্রিক আদর্শ দেখে অন্য ধর্মের অসংখ্য মানুষ দলে দলে এসে শান্তির ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছে।

স্বয়ং নবী করিম (সাঃ) আরাফাতের ময়দানে বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন,

১। হে মানব মণ্ডলী! তোমরা আমার কথাগুলো অনুধাবন কর, নিশ্চিত কর বুঝতে। তোমরা শিক্ষা পেয়েছ প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সকল মুসলমানই এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। এটা কোন মানুষের জন্যই অবৈধ নয়। অনুমতি ব্যতীত অন্যের জিনিস গ্রহণ করবে না। সুতরাং কেউ কারো প্রতি অবিচার করো না।

২। সাবধান! ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না। এই বাড়াবাড়ির ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।

৩। হে মানববৃন্দ! কোন দূর্বল মানুষের উপর অত্যাচার করো না, গরীবের উপর অত্যাচার করো না। সাবধান! কারো অসম্মতিতে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। সাবধান! মজুরের শরীরের ঘাম শুকা‘বার পূর্বেই তার মজুরী মিটিয়ে দিও। তোমরা যা-খাবে ও পরবে, তা তোমাদের দাস-দাসীদের খেতে ও পরতে দিও। যে মানুষ দাস-দাসীদের ক্ষমা করে ও ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন ও ভালোবাসেন।

৪। সমাজে তোমার আচরণ ঐ রূপ হবে, যেমন আচরণ তুমি অন্য থেকে কামনা কর। সমাজে তোমার ব্যবহার ঐরূপ হবে, যেরূপ ব্যবহার তুমি নিজে পেলে খুশি হও।

এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন নয়, বরং মানবসমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশও।
ঈশ্বরের (আল্লাহর) প্রতি আনুগত্য, তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম সব বিষয়ই এই ভাষণে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ভাষণে তাকওয়া বা কর্তব্যনিষ্ঠার কথাতেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং কঠোর হুশিয়ারী ছিলো পাপাচারের বিরুদ্ধে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আজ আমরা ধর্মান্ধ, স্থূল ও যুক্তিহীন চিন্তার বাহক। এভাবে প্রতিদিনই এ বৈষম্য বেড়ে চলছে। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের আহ্বানে সাড়া না দিতে পারলে, এ পার্থক্য কমবার নয়!

 

লিখেছেনঃ

মোঃ রুহুল আমিন
সরকারি এম এম কলেজ, যশোর।
বিষয়ঃ বাংলা (সম্মান), বর্ষ- ২য়
ই-মেইলঃ ruhulamin807@gmail.com

You May Also Like