খানজাহান আলী ও বিদ্যানন্দকাটী খানজাহান দীঘি

– অধ্যক্ষ রুহুল আমিন

“আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিয়ামাতি ওয়ারাদিতু লাকুমুল ইসলামা দীনা”অর্থঃ  আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করিয়া দিলাম, এবং আমি ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে মনোনীত করিলাম’। উল্লেখিত বাণীটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন তার পবিত্র কালাম কুরআন মজিদের ‘সূরা মায়দাহ’ উল্লেখ করেছেন। দশম হিজরীর ৯ জিলহজ্জ শুক্রবার ছিল ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের দিন। ওই দিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরাফার ময়দানে প্রায় দেড়লক্ষ সাহাবীর সামনে তার অনুসারীদের জীবন চলার পথে কি করনীয় তার দিক নির্দেশনা মূলক যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা আজও ইসলাম ধর্মের অনুসারিদের জন্য রক্ষাকবচ। তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে তিনি সেদিনের উপস্থিত সাহাবিদের অনুপস্থিত সকল মানুষের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের পর প্রায় আছরের সময় জাবালে রহমতের সন্নিকটে উল্লেখিত আয়াত নাজিল হয়। বিদায় হজ্বের পর নবী করিম (সাঃ) মাত্র একাশি দিন জীবিত ছিলেন। হযরত মুহম্মাদ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর তাঁর লক্ষ লক্ষ সাহাবী বিদায় হজ্বে রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী দীনের দাওয়াতের কাজে ব্রতী হন। সামরিক, বেসামরিক যে যেভাবে পেরেছে দীনের দাওয়াতের কাজ করেছে। খেলাফায়ে রাশেদিনের জামানায় বিশেষকরে হযরত ওমর (রাঃ) খেলাফত কালে ইসলামের বিজয় রথ দুর্বার গতিতে চলতে থাকে। বিজিত অঞ্চলে মুসলিম সেনাবাহিনী ও সেনাপতিদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে লোক ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হয়েছে।

সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি বেসামরিক সাহাবাগণ অবিজিত অঞ্চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীন ইসলাম প্রচার করেছে। অনেক সাহাবী দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে বিধর্মীদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেছে। ৭১২ খৃষ্টাব্দে মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু-মুলতান অধিকারের মধ্যে দিয়ে মুসলমানদের ভারতবর্ষে বিজয় অভিযান শুরু হয়। পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদ, মুহম্মদ ঘোরী, দাস, খিলজি, তোঘলক, আফগান ও মুঘলগণ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়ের পাশাপাশি বঙ্গদেশেও শাসন কার্য বিস্তৃত করেন। ১২০১ খৃষ্টাব্দে বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের মধ্যে দিয়ে বঙ্গদেশ প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম শাসনাধীনে আসে। এই বিজয়ের পাশাপাশি অলি-আওলিয়া-সুফি-দরবেশরাও বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে যে দুই জন আউলিয়া বেশী অবদান রাখেন তার একজন হযরত শাহ-জালাল (রঃ) এবং অপর জন হযরত খান-ই-জাহান আলী (রঃ)। হযরত শাহ-জালাল (রঃ) সিলেট অঞ্চলে এবং খান-ই-জাহান (রঃ) যশোর-খুলনা অঞ্চলে স্থায়ী হাবলী বা বাসস্থান করে ইসলাম ধর্ম প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। এই দুই সাধক ইসলাম ধর্ম প্রচার করলেও দুই জনের কাজের মধ্যে অনেকটা পার্থক্য ছিল। হযরত শাহ-জালাল (রঃ) ছিলেন শুধুই ধর্ম প্রচারক আর হযরত খান-ই-জাহান (রঃ) ছিলেন শাসক ও ধর্ম প্রচারক। খান-ই-জাহান (রঃ) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের তথা যশোর-খুলনা অঞ্চলের শাসক ও ধর্ম প্রচারক। তার রাজধানী ছিল বাগেরহাট। তার শাসিত জনপদের  নাম ছিল খলিফাতাবাদ। তার কীর্তি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের কিছুটা পিছনে ফিরে যেতে হবে।

খান-ই-জাহান আলী’র প্রথম জীবন সম্পর্কে একাধিক তথ্য পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় জানা যায় খান-ই-জাহান (রঃ) পূর্ব পুরুষরা ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। সেখান থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বাগদাদে আসেন। ১২৯৮ খৃঃ হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করে বাগদাদ নগরী ধ্বংস করলে সেখান থেকে খান-ই-জাহানের পিতামহ হুমায়ুন মালিক প্রথমে কাবুলে যান। সেখান হতে তিনি দিল্লীতে আসেন। দিল্লীতে আসার পর তার সততা, নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের জন্য দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক তাকে প্রধান উজিরের(উজিরে মোবালেক) পদে নিয়োগ করেন। এই পদে তিনি ১৩৫১ হতে ১৩৫৭ খৃঃ পর্যন্ত নিযুক্ত ছিলেন। হুমায়ুন মালিক কাবুল ১৩৭০ খৃঃ ইন্তেকাল করেন। তখন খানজাহান (রঃ) বয়স ছিল মাত্র একবছর। খান-ই- জাহানের পিতার নাম ছিল আকবর খান ও মাতার নাম আম্বীয়া বিবি। খানজাহান ১৩৬৯ খৃঃ দিল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন। আকরার খান বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাজ পরিবারের গৃহ শিক্ষক নিযুক্ত হন। খান-ই-জাহানের বাল্যকালের নাম ছিল ‘উলুঘ খা’, অপর নাম ‘কেশর খা’। খানজাহানের লেখাপড়ায় হাতে খড়ি হয় তার বিদ্বান পিতার হাতেই। পাশাপাশি আধ্যাত্মিক তালিম চলতে থাকে তৎকালীন দিল্লীর আধ্যাত্মিক নেতা শাহ নেয়ামতুল্লার(রঃ) হাতে। ১৩৮৯ খৃঃ ২১ বছর বয়সে তার পিতা মারা গেলে জীবন-জীবিকার জন্য বাধ্য হয়ে তুগলক সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এই চাকুরিতে সাত বছর থাকার পর জৌনপুরের গভর্নর নিযুক্ত হন। পরে বংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের আমন্ত্রণে অনুচরসহ বাংলায় আসেন। বাংলায় এলে গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ তার বন্ধু পাণ্ডুয়া মাদ্রাসার প্রধান মোদারেস নুর-কুতুবুল আলম (রঃ) নিকট পাঠালে তিনি খান-জাহানকে তার মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ করেন। এখানে পাণ্ডুয়ার নবীপুর গ্রামে খান-জাহান প্রায় দশ বছর বসবাস করেন। (এ গ্লিমস অব গ্রেট খানজাহান (রঃ)

অন্য বর্ণনায় আছে আকবার খান ভাগ্যান্বেষনে সপরিবারে দিল্লী থেকে গৌড়ে আসেন এবং রাজ পরিবারের গৃহ শিক্ষক নিযুক্ত হন। সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব নিজে পালন করেন। পরবর্তীতে গৌড়ের বিখ্যাত দরবেশ হযরত নুর-ই-কুতুবুল আলম (রঃ) মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। মাদ্রাসার শিক্ষার পাশাপাশি তিনি তার আধ্যাত্মিক সাধক তার ওস্তাদের নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। উলুঘ খানের প্রতি তার শিক্ষক এতই খুশি হন যে, উলুঘ খান যৌবনে পদার্পন করলে নুর-ই-কুতুবুল আলম(রঃ) তার কন্যা সোনা বিবির সংগে তার বিবাহ দেন। বিবাহের কিছু দিন পর উলুঘ খান তাঁর শ্বশুরের নিকট কর্মসংস্থানের আবেদন জানালে দরবেশ নুর-ই-কুতুবুল আলম(রঃ) তার প্রিয়পাত্র জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম-শাহ-শার্কীকে উলুগ খানের পরিচয় জানিয়ে তার একটি কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। সুলতান দরবেশের অনুরোধে উলুগ খানকে তার সেনাবাহিনীতে চাকুরীর ব্যবস্থা করেন। সেনাবাহিনীতে চাকুরী পাওয়ার পর উলুগ খান নিজ যোগ্যতার বলে সেনাপতির পদ লাভ করেন। বাংলায় তখন ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন চলছিল। সে সময় ভাতুড়িয়ার জমিদার ছিলেন রাজা গনেশ। গনেশ ইলিয়াস শাহী সুলতানদের আমাত্য ছিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। কেহ কেহ মনে করেন ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহকে গুপ্ত হত্যা করে রাজা গণেশ বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

এ সময় বাংলার রাজধানী গৌড়সহ তার চারপাশে অনেক মুসলিম ফকির-দরবেশ বসবাস করতেন। রাজা গণেশ সিংহাসন অধিকার করে মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও নিপিড়ন করতে থাকেন। কথিত আছে, একবার এক মুসলমান প্রজা তার পুত্রের আকিকারের জন্য একটি গরু জবেহ করেন। জবাইকৃত গরুর একখণ্ড মাংস কাকে নিয়ে রাজপ্রসাদের ভিতর ফেললে রাজা ক্রধান্বিত হয়ে ওই প্রজাকে তার শিশুপুত্রসহ গ্রেফতার করেন। গ্রেফতার কৃত শিশুটিকে রাজাদেশে হত্যা করা হয়। এই সংবাদ গৌড়ের দরবেশ-প্রধান নুর-ই-কুতুবুল আলম(রঃ) নিকট পৌছালে তিনি তার প্রিয়পাত্র জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম-শাহ-শর্কীকে পত্র মারফত বিষয়টি অবগত করান এবং মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য গৌড় আক্রমনের আহবান জানান। এই আহবানে ইব্রাহিম-শাহ-শর্কী তার সেনাপতি উলুগ খানকে সংগে নিয়ে গৌড় আক্রমণের জন্য উপস্থিত হলে রাজা গনেশ নতি স্বীকার করেন এবং নুর-কুতুবুল-আলম(রঃ) শরণাপন্ন হয়ে আপস করেন। আপোষের শর্তানুযায়ী রাজা গনেশের পুত্র যদুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয় এবং যদুই জালাল উদ্দীন মাহমুদ নাম ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন। সুলতান ইব্রাহিম-শাহ-শর্কী জালাল উদ্দীনকে সিংহাসনে বসাইয়া জৌনপুরে ফিরে যান।

কোন কোন সূত্র থেকে জানা যায়, ইব্রাহিম-শাহ-শর্কী জৌনপুরে ফিরে গেলে রাজা গনেশ যদুকে অপসরণ করে নিজেই শাসনদণ্ড পরিচালনা করেন। রাজা গণেশ পুত্র যদুকে সুবর্ণধেনু ব্রত দ্বারা প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করেন। রাজা গনেশের এই প্রতারণার কথা ইব্রাহিম-শাহ-শর্কী জানতে পেরে তার সেনাপতি উলুগ খানকে পুনরায় গৌড় আক্রমণের নির্দেশ দেন। উলুগ খান স্বসৈন্যে গৌড়ের পথে অগ্রসর হলে রাজা গণেশ যদুকে সিংহাসন দিয়ে দিনাজপুরের পথে পালিয়ে যান। উলুগ খান বিনা রক্তপাতে গৌড় অধিকার করেন। গৌড় অধিকারের সংবাদ জৌনপুর পৌঁছালে ইব্রাহিম-শাহ-শর্কী উলুঘ খানকে ‘খান-ই-জাহান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। যদু ইসলাম ধর্ম কখনই পরিত্যাগ করবেনা এরূপ প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই খান-ই-জাহান বেশ কিছু দিন গৌড়ে অবস্থান করে যদুকে পুনরায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং পূর্বের ইসলামি নাম জালাল উদ্দীন মাহামুদ নামে পুনঃরায় গৌড়ের শাসন কার্য পরিচালনা করতে সহযোগিতা করেন। বাস্তবিকই পরবর্তীতে তিনি আমৃত্যু স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ সপরিবারে ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাবাদর্শে লালিত সতীশ চন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, খান-ই-জাহান ফিরোজ-শাহ-তুগলকের একজন প্রভাবশালী সভাসদ ছিলেন। ফিরোজ-শাহের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে গোলযোগ দেখা দেয়। পাঁচ বছরে পাঁচ জন শাসকের বিদায়ের পর ফিরোজ-শাহের এক নাবালক পৌত্র মামুদ তোগলক সিংহাসনে বসেন। সারা দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা চলছিল। তার উপর তৈমুর লঙ দিল্লী আক্রমণ করলে দিল্লী নগরী শ্মশানে পরিণত হয়। এই সুযোগে মাহামুদের এক উজির খাজা-জাহান জৌনপুরে এক নতুন রাজ্য স্থাপন করেন। খাজা-জাহান খোজা বা নপুংসক ছিলেন। তার কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তিনি পালিত পুত্র ইব্রাহিমের উপর শাসন ভার দিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও পূর্ণকাজে শেষ জীবন অতিবাহিত করবার জন্য পূর্বাঞ্চলে আসেন। সতীশ চন্দ্র মিত্র চতুর্থ পরিচ্ছেদে ‘খাঁ জাহান আলি’ পর্বের শেষে বলেছেন, “যাহা হউক, আমরা যতদূর বুঝিতে পারিতেছি, তাহাতে জৌনপুরের শাসনকর্তা খাজা-জাহান ও যশোর-খুলনার খাঁ জাহানালি এক ব্যক্তি। প্রবাদ এই, হিন্দুূ-মুসলমান-ঘটিত কোন গুরুতর কোন বিবাদের মিমাংসার জন্য তিনি সসৈন্যে বঙ্গে আসেন। আসিতে তার অনেক দিন লাগিয়াছিল। গঙ্গা পার হইয়া নদীয়ার মধ্যে দিয়া ভৈরবের কুল দিয়া তিনি প্রথম বারবাজারে উপনীত হন। হয়ত তৎসন্নিকটেই তাঁহার কার্য্য ছিল এবং সেখানে থাকিয়া সেই কার্য্যের মীমাংসা করেন। এই বার বাজারেই তাঁহার কর্মক্ষেত্রের দ্বার উদঘাটিত হয়।”

উল্লেখিত অংশটুকু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় খাজা জাহান একজন খোজা বা নপুংস ছিলেন। নিজের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তিনি তাঁর প্রভুর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে নিজ রাজ্যে স্থাপন করেছিলেন। তাও আবার নিজের জন্য নয়, পালিত পুত্রের জন্য। এছাড়া তিনি হিন্দু-মুসলমান বিরোধ মিমাংসার জন্য সসৈন্যে বাংলায় এসেছিলেন। আমরা আগেই জেনেছি রাজা গনেশ মুসলিম বিদ্বেষি ছিলেন। তিনি ইসলাম অনুসারিদের প্রতি বিরুপ ভাবাপন্ন ছিলেন। পরবর্তী সময় ইব্রাহিম-শাহ-শরকী গৌড় আক্রমণ করলে তিনি ছলনার আশ্রায় নিয়ে তার পুত্রের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যে শঠতার আশ্রয় নিয়ে গৌড়ের সিংহাসনে টিকে থাকতে চেয়েছিলেন, তার প্রেক্ষিতে খানজাহান সসৈন্যে বাংলায় এসেছিলেন। বহুল প্রচারিত এই ঘটনাকে সতীশ চন্দ্র মিত্র সুকৌশলে পাশ কাটিয়ে এই ঘটনাটিকে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা আরও জানি- সকল ইসলাম ধর্ম প্রচারকগণ ধর্ম প্রচারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁরা দুনিয়ার পার্থিব বিষয়ের প্রতি অনাসাক্ত ছিল। এমন একজন নির্লোভ মানুষ পরের সন্তানের জন্য অন্নদাতা প্রভুর সংগে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজ রাজ্য স্থাপন করার কথা কল্পনাও করা যায় না।

ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান ও এ.টি.এম.সামছুজ্জোহা’র ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় মুহাম্মদ বিন তুগলকের আকস্মিক মৃত্যুতে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। এ সময় থাট্টার আমির ও সুলতানের চাচাত ভাই ফিরোজ অধিকাংশ আমির উমরাহদের অনুরোধে ১৩৫১ খৃষ্ঠাব্দে ২৩ মার্চ “ফিরোজ শাহ তুগলক” উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। এদিকে মন্ত্রী খাজা জাহান মুহাম্মদ বিন তুগলকের বোন খোদা বন্দাজাদা বেগমের অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্র দাওয়ার মালিককে প্রয়াত সুলতানের পুত্র বলে ঘোষণা করে নিজ অভিভাবকত্বে দিল্লীর সিংহাসনে বসান। কিন্তু অভিজাত শ্রেনীর সমার্থন না পাওয়ায় ফিরোজ শাহ তুগলকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সুলতান তাকে ক্ষমা করে সামানার গভর্নর নিয়োগ করেন। পরে খাজা জাহান নিহত হন। অনেকের ধারনা আমির-ওমরাহদের চাপে সুলতান ফিরোজের নির্দেশে খাজা-জাহানকে হত্যা করা হয়। উপরোল্লেখিত বর্ণনা হতে এটা নিশিচত যে, ফিরোজ শাহের আমির খাজা জাহান ও খলিফাবাদের খান জাহান একই ব্যক্তি নয়। পাশাপাশি সতীশ চন্দ্র মিত্র তার যশোর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে অনেক তত্ত্ব-তথ্যের সমাবেশ ঘটালেও অনেক স্থানে সুকৌশলে সত্যকে এড়িয়ে গেছেন বা বিকৃত করেছেন।

যদু ওরফে জালাল উদ্দিন মাহমুদ দ্বিতীয় বার গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করলে মুসলমানরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন। জালাল উদ্দিন এটা অনুভব করে পাণ্ডুয়ার এক জনাকীর্ণ সমাবেশে নিজেকে ইসলামের একজন নিবেদিত খাদেম ঘোষণা দেওয়ায় এবং দ্বিতীয় বারের মত একজন মুসলিম সুলতান রূপে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ায় যাবতীয় জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে। এ সময় জালাল উদ্দিন খানজাহানকে তার রাজসভায় যোগ দেওয়ার আহবান জানান। খানজাহান তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এবং বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচারের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। জালাল উদ্দিন মাহমুদ সানন্দে তাতে সম্মতি প্রদান করেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল তখন অনুন্নত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। ইসলাম প্রচারে বের হওয়ার পূর্বে সংক্ষিপ্ত সফরে খানজাহান ফতেয়াবাদের ওলি ও কামেল শাহআলী বাগদাদীর সাথে সাক্ষাত করে নিজের যুদ্ধবর্ম তাকে উপহার দেন। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বিদায়ের সময় বাগদাদীর দুই সাগরেদ চাঁদ খাঁ ও বাহাদুর খাঁ খানজাহানালির সফর সঙ্গী হন। এরপর শিষ্যশ্বাবত নিয়ে বর্তমান যশোরের উত্তরে বারবাজার এসে আস্তানা গাড়েন।

খানজাহান আলী কতজন সঙ্গিসাথী নিয়ে বারবাজারে এসেছিলেন তার কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তার সাথে বিশাল সেনাবাহিনী ছিল বলে মনে হয় না। তবে তারঁ সঙ্গে আসা যে এগার জন প্রসিদ্ধ কামেল আওলিয়া ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। সেই সকল দরবেশগণ হলেনঃ  ১) মহিউদ্দিন রেবাস শাহ, ২) গরীব শাহ, ৩) বাহরাম শাহ,  ৪) বুরহান উদ্দিন খাঁ (বুড়া খাঁ), ৫) ফতে খাঁ, ৬) ইক্তিয়ার খাঁ, ৭) বক্তিয়ার খাঁ,  ৮) আলম খাঁ,  ৯) মীর খাঁ, ১০) পীর খাঁ, ও ১১) চাঁদ খাঁ। উল্লেখিত ১১ জন ছাড়াও আরও কয়েকজন অনুসারী খানজাহানের প্রিয়পাত্র ছিলেন। এরা হলেন- ক) পীর আবু তাহের, খ) সৈয়েদ আহম্মদশাহ, গ) পীর মেহেরুদ্দিন, ঘ) পীর জাফর আউলিয়া, ঙ) পীর জিয়া উদ্দিন, চ) পীর জয়নুদ্দিন, ছ) পীর খালেস খাঁ প্রমূখ।

বার বাজারের পূর্বনাম ছিল ‘গঙ্গে’, ‘বাবুরাজার’ ও ‘ছাপাইনগর’ বা চম্পকনগর। বারবাজার পূর্বে একটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা ছিল। যার বহু নিদর্শণ আজও বিদ্যমান। প্রচলিত প্রবাদ আছে, খানজাহান আলির বিশিষ্ট এগার জন সাগরেদসহ তিনি বারটি স্থানে অবস্থান করায় বারটি স্থানে লোক সমাগম ঘটতে থাকে। লোক সমাগমের বারটি স্থানে দ্রুত বাজার গড়ে ওঠে। এই বারটি বাজারকে কেন্দ্র করে এই স্থানের নামকরণ হয় “বারবাজার”। এখানে গাজী, কালু ও চম্পাবতীর মাজার আজও বিদ্যমান। বার বাজার অঞ্চলে ছবুড়ি ছয়ডা অর্থাৎ একশত ছাব্বিশটি খানজাহান আলীর কীর্তি রয়েছে। খানজাহান এখানে কিছু দিন অবস্থানের মহিউদ্দিন বেরাস শাহকে এখানকার গভর্ণর নিযুক্ত করে ষোল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে আরেক পুরাতন শহর মুরলী আসেন। বারবাজার থেকে মুরলী পর্যন্ত আসতে যে রাস্তা তিনি তৈরী করেন তা তার পূর্বসুরী তাপস গাজীর নামানুসারে ‘গাজীর জাঙ্গাল’ রাখেন।

মুরলী পৌঁছে খানজাহান এর নাম দেন ‘মুরলী কসবা’। এই মুরলী কসবা থেকে উত্তর-পশ্চিমে চার মাইল দূরত্বে একটি নতুন শহর নির্মাণ করে তার নাম দেন ‘ছানি কসবা’। যার বর্তমান নাম “পুরাতন কসবা”। বারবাজার, ছানি কসবা, ও মুরলী কসবা এলাকায় অসংখ্যা লোক তাঁর হাতে বায়াত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। মুরলি কসবায় থাকাকালীন সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভাঁটি অঞ্চলে দ্রুত ইসলাম প্রচারের জন্য তার কাফেলাকে পাশাপাশি দুই ভাগে বিভক্ত করে ভাঁটি অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হবেন। মুরলী কসবার শাসনভার তার দুই সহচর গরীবশাহ ও বাহরাম শাহের হাতে ন্যস্ত করা হয়।  সিদ্ধান্তানুযায়ী একটি দলের নেতৃত্ব দেবেন তার প্রধান সাগরেদ বুরহান খাঁ ওরপে বুড়া খাঁ ও তার পুত্র ফতে খাঁ। এই দলটি কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীর ধরে খানপুর, কেশবপুর হয়ে বিদ্যানন্দকাটী, মাগুরাঘোনা, আটারই, জেয়ালা, তালা, চাপানঘাট, খলিলনগর, গঙ্গারামপুর, ঘোষনগর, কপিলমুনি, রামনাথপুর, গদাইপুর, মঠবাড়িয়া, লক্ষ্মীখোলা, গজালিয়া, আমাদী, মসজিদকুড় হয়ে গভীর অরণ্যে বেদকাশীতে গিয়ে পৌঁছায়। দ্বিতীয় দলটির নেতৃত্ব দেন খানজাহান আলী নিজেই।

মুরলী কসবা থেকে খানজাহান আলী সৈন্য ও অনুচরসহ ভৈরবের কূল দিয়ে পূর্বমুখে চলতে থাকেন। তিনি যে সকল জনপদের উপর দিয়ে তার গন্তব্য পৌঁছান সেগুলো হলো রামনগর, বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়া, পয়ঃগ্রাম কসবা, রানাগাতি, গোপীনাথপুর, সিদ্দিপাশা, বারাকপুর, দিঘলিয়া, সেনহাটি, ফরমায়েস খানা, চন্দনী মহল, দেয়াড়া, সেনের বাজার, শ্রীরামপুর, নৈহাটি, সামান্তসেনা, সাতসিকা, আট্রাকা, রাজাপুর, মরগা হয়ে বারাকপুর এসে পৌঁছান। উল্লেখিত দুুুুটি দল ছাড়াও আরও একটি দল ইসলামের প্রচারকার্যে অংশগ্রহণ করে। এই দলটির নেতৃত্ব দেন ওয়াজিল খান। ইনি নিজ ইচ্ছায় স্বল্প কয়েকজন সংগীসহ খানজাহানের অনুমতি নিয়ে বর্তমান যশোরের শেখেরহাট নামক স্থান হতে নৌকাযোগে তৎকালিন চন্দ্রদ্বীপের গৌরনদী নামক স্থানে পৌঁছান। গৌরনদী চাঁদসী ইউনিয়নের বড় কসবা ছোট কসবা ছাড়াও বারথি ইউনিয়নের কসবা ও লাখেরাজ কসবা মেহেন্দীগঞ্জের লতা ইউনিয়নের কসবা ও কসবা গ্রাম, তেঁতুলিয়া, গৌরনদী, গোবিন্দপুর, প্রভৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা হিজলার কসবা ইত্যাদি জনপদসহ কসবার ‘আল্লার ঘর’ নামি ও নয় গম্বুজ মসজিদ যা আজও অক্ষত তা এদেরই তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও এই অঞ্চলে আরও পাঁচটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল যার অস্তিত্ব আজ আর নেই।

খানজাহান আলীর অনুসারিদের মধ্যে পিরাল্যা সম্প্রদান বলে একটি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। এদের উৎপত্তিস্থল পয়ঃগ্রাম কসবা। যাদের নেতা ছিলেন গোবিন্দ লাল রায়। এর অন্যান্য সদস্যরা হলেন অরবিন্দু লাল রায়, কামদেব, জয়দেব, জয়ন্ত, কেদার লাল, রূপাদেবী প্রমূখ। এরা সবাই হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে আবু তাহের, মোতাহার, কামাল উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, জয়নুদ্দিন, কেদার খান, বিবি বেগেনী প্রমূখ নামে পরিচিত হন। এরা সকলেই খানজাহানের বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন। খানজাহানালির মাজার সংলগ্ন পশ্চিম পাশ্বেই আবু তাহেরের মাজার রয়েছে। খানজাহান ১৪১৯ খৃঃ বারবাজার হতে দক্ষিণ ও দক্ষিন-পূর্ব মুখী রওনা হয়ে যে সব জনপদের উপর দিয়ে অগ্রসর হন, সেই সব জনপদে জলকষ্ট নিবারনের জন্য অনেক পুকুর, রাস্তাঘাট, মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি সুশাসনের ব্যবস্থা করেন। তার শাসিত রাষ্ট্রের যে পত্তন করেন ১৪২৯ খৃঃ তার নাম দেন “খলিফাতাবাদ”।

যতদুর জানা যায় তার রাজ্য প্রতিষ্ঠায় ত্রিপক্ষীয় মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। রাজা কর্ণওয়ালী, রাজা বলভদ্রদেব ও সেনাপতি লাল চন্দ্র তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে কর্ণপুর, সামান্তসেনা, রণভূমি, রণজিৎপুর, পিলজঙ্গ, রণবিজয়পুর, ফতেপুর ও বিজয়পুরে যুদ্ধ করতে হয়। খান-জাহান আলী নিজে ছিলেন পরাক্রমশালী সেনাপতি। তাঁর অধীনে শাহবাজ খান, ইক্তিয়ার খান, বক্তিয়ার খান, বাহাদুর খান, লস্কর খান, গদা খান, ফিদাই খান, কেদার খান প্রমূখ শক্তিশালী যোদ্ধাগণ ছিলেন।

খানজাহান তার সদ্য বিজিত এলাকা সমূহ নিয়ে একটি নামের কথা ভাবছিলেন; ঠিক সেই সময় মুসলিম বিশ্বের মিশরীয় সুলতান বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিনকে ‘খলিফত উল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই উপলক্ষে খানজাহান তার বন্ধুপ্রতীম সুলতান জালাল উদ্দিনকে ষাট গুম্বজ চত্বরে সম্বর্ধনা দেন। সেই অনুষ্ঠানেই তাঁর বিজিত রাজ্যের নামকরণ করেন “খলিফাতাবাদ রাজ্য”। সুলতান জালাল উদ্দিন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে এই ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিয়ে গৌড়ে ফিরে গেলেন। ‘খলিফাতাবাদ’ রাজ্যটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আর একটি স্বীকৃত রাজ্যের মর্যাদা পেল। বাংলার পরবর্তী সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের পালক পিতা ও পীর কেবলা ছিলেন স্বয়ং খান-জাহান (রঃ)। সেকারণে তার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য বাগেরহাট মিঠাপুকুর পাড়ে বাংলার ১০ নম্বর টাকশালটি নির্মাণ করেন তার পীরের জন্য। খানজাহানের মৃত্যুর সংবাদে সুলতান নাসির উদ্দিন মুর্চ্ছা যান এবং একদিন পর মারা যান।

খানজাহান তার খলিফাতাবাদ রাজ্যেকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ছয় ভাগে বিভক্ত করে শাসক নিয়োগ করেন। সেগুলো হলোঃ ১। বারোবাজার ; যার শাসক ছিলেন মহিউদ্দিন রেবাস শাহ  ২। মুরলী কসবা; যার দুইজন শাসক ছিলেন (ক) গরীব শাহ (খ) বাহরাম শাহ  ৩। আমাদী কসবা; যার দুই জন শাসক ছিলেন (ক) বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ (খ) রোরহান খাঁ’র পুত্র ফতে খাঁ৪। পায়ঃগ্রাম কসবা; যার শাসক ছিলেন আবু তাহের ৫। হাবেলী কসবা ; (ক) জিন্দাপীর সৈয়েদ আহম্মদ শাহ (খ) ঠাণ্ডাপীর মীর খান (গ) পাগল পীর পীর খান ও ৬। গৌরনদী কসবা ; যার শাসক ছিলেন ওয়াজিল খাঁন। উল্লেখিত শাসকগণ ছাড়াও খলিফাতাবাদ রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অঞ্চলভিত্তিক আরও অনেক সংখ্যাক অধিনস্ত প্রশাসক বা জায়গীরদার নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কামাল উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, খালেস খাঁ, সরফরাজ খাঁ, জাফর খাঁ, মেহের উদ্দিন, জয়নুদ্দিন প্রমূখ।তার শাসন কালে সুশাসনেরজন্য দেশে শান্তি বিরাজ করত। খানজাহানকে সকল ধর্মের প্রজারা সমান ভাবে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতো। খানজাহানের রাজত্বকালে বরিশালের রাজা ছিলেন হরিবল্লভ। খানজাহান আলীর সংগে তার সম্পর্ক ছিল সুপ্রতিবেশী সুলভ। পাশাপাশি দুটি রাজ্য সুপ্রতিবেশী সুলভ শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানে থেকে শাসনকার্য পরিচালিত হত।

খাঁনজাহান তার খলিফাতাবাদ রাজ্যে ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর, রাস্তা-ঘাট, পুল, কালভাট, মসজিদ, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নির্মাণ করেন। ষাট গুম্বুজ মসজিদ, ঠাকুর দীঘি, ঘোড়া দীঘি, নিজ মাজার তার আমলের অমর কীর্তি। তাঁর উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মাণে পাথরের ব্যবহার করেছেন। এসব পাথর তিনি চট্টগ্রাম থেকে নদী পথে এনেছিলেন। খানজাহান সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন। তার অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনী দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। ঠাকুর দীঘিতে কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় কুমিরের বংশধররা তার মহিমার গুনকীর্ত্তনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে।  খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে প্রায় তিনবার ভূমিঅবনমন হয়েছে। যার ফলে খানজাহানের স্থাপত্য শিল্পগুলির প্রায় নব্বই শতাংশ ধ্বংস হয়ে মাটির নীচে চাপা পড়েছে। এছাড়াও দুষ্টপ্রকৃতির লোকেরাও পরিকল্পিতভাবে তার অনেক কীর্তি ধ্বংস করেছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ঘরে ঘরে মানুষ শ্রদ্ধাভরে সাধক খানজাহানের নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খানজাহানের থান বা দরগার নামে অসুখ-বিসুখ, বিপাদ-আপাদ, মামলা-মকদ্দমা ও মনোষ্কামণা পুরণের জন্য মানত করে ফল লাভ করে আসছে। এমনই একটা দরগা বা থান বিদ্যানন্দকাটি খানজাহান আলীর দরগা ও দীঘি। যাকে এলাকার লোক খানজাহান দরগা বা খাঞ্জানতলা বলে। মুরলী কসবা থেকে বুরহান উদ্দিন খাঁ সৈন্যসামান্ত ও অনুসারিদের সংগে নিয়ে দক্ষিনদিকে এসে খানপুর অবসাথান করেন। তার চলার পথে খানজাহানের উপদেশ মত রাস্তা তৈরী ও পুকুর-দীঘি খনন করতে করতে অগ্রসর হতে থাকেন। খানপুরের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর ইসলামের এই কাফেলা কেশবপুরের উপর দিয়ে বিদ্যানন্দকাটী গিয়ে আস্তানা গাড়ে। বিদ্যানন্দকাটী একটি প্রাচীন গ্রাম। এককালে এই গ্রামে বহু সংখ্যক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিদের বসবাস ছিল বলে মনে করা হয়। এখানে পাঠান যুগেরও বহু নিদর্শণ বিদ্যমান। বিদ্যানন্দকাটির আশপাশে সরফাবাদ ও মির্জাপুরেও বেশ কিছু খানজানালি দীঘি-পুকুর রয়েছে। সরফাবাদ গ্রামের বাসিন্দা অধ্যাপক আক্কাস আলী মোড়ল জানান বিদ্যানন্দকাটী দীঘি খনন কালে খানজাহান আলী স্বয়ং কিছুদিন এখানে অবস্থান করেন। দীঘি খননকালে খানজাহানের এক অনুচর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিনি এখানে মারা যান। সম্ভাবতঃ তার নাম সরফরাজ খাঁ। ধারনা করা হয় মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার মুরর্শিদ খান-জাহানকে দেখতে চেয়েছিলেন। আর সে কারণেই খানজাহান এখানে আসেন। তার মৃত্যুর পর তাদের পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দফন করা হয়। সে কারণে সরফরাবাজের নাম অনুসারে ওই গ্রামের নাম হয় সরফাবাদ। তবে কোনটা সরফরাজ খাঁর কবর তা তিনি বলতে পারেননি। তিনি জানান এই তথ্যটি তিনি তার পূর্ব পুরুষদের নিকট থেকে জেনেছেন।

বিদ্যানন্দকাটি দীঘি সম্পর্কে সতীশ চন্দ্র মিত্র অনেক অদ্ভুত জনশ্রুতির কথা আছে বলেছেন। তিনি তার বই-এ একটি জনশ্রুতি তুলে ধরেছেন। সেটি  এ রকমঃ এই দীঘি খননকালে বাগেরহাটের ঠাকুর দীঘি খননের সময় একটি যোগীমূর্তি বাহির হয়েছিল; বিদ্যানন্দকাটী দীঘি খননের সময়ও ধ্যানী বৌদ্ধ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই  দীঘির দৈর্ঘ্য ষোল’শ হাত এবং প্রস্থ সাত’শ হাত। দীঘিটি উত্তর-দক্ষিনে লম্বা। দীঘির উত্তর ও পূর্ব দিক দিয়ে বুড়ি ভদ্রা নদী আজও ক্ষীন ধারায় প্রবাহিত। দীঘিটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। গৃষ্মের দিন বিকাল বেলা দীঘির পশ্চিম পাড়ে ঘন গাছের নিচে দাঁড়ালে দীঘির উপর দিয়ে বয়ে আসা মৃদুমন্দ জল হাওয়া হৃদয়-মন ছুঁয়ে যাবে। এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে সরকারী পৃষ্টপোষকতা পেলে দর্শনার্থীদের জন্য স্থানটি সত্যিই দর্শনীয় হত। দীঘিটি সম্পর্কে সতীশ চন্দ্র মিত্র যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ‘ সম্ববতঃ কোন পুরাতন বৌদ্ধযুগের দীঘি পুনরায় খনন করা হয়।’ তাঁর এই বক্তব্যের সপক্ষে তিনি কোন যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।

অতীতের ন্যায় এখনও প্রতি শুক্রবার প্রায় ১০০/১৫০ লোক দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে প্রায় ৯০০ বছরের পাপুড় গাছের নিচে জমায়েত হয়। যারা এখানে আসে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে পীর খান-জাহান (রঃ) উছিলায় আল্লাহপাক  তাদের বিপাদ-আপদ, অসুখ-বিসুখ, অমঙ্গল-কুনজর থেকে হেফাজাত করেন এবং তাদের মনোবাসনা পূরণ করেন। প্রতিমাসের আমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথীতে এই খাঞ্চান দরগায় প্রায়  ১৫০/২০০ লোক উপস্থিত হয়ে খান-জাহান (রাঃ) উছিলায় আল্লার রহমত কামনা করে সারা-রাত অতিবাহিত করে। এই সময় তারা পাপুড় গাছের নীচে খোলা মাদুলি রেখে দেয়। সকালবেলায় ওই মাদুলির ভিতর ধূলা-বালি-মাটিযা কিছু ঢুকলেই তাদের মাদুলি খান-জাহান (রঃ) উছিলায় পূর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেয়। যে নিয়তে ওই মাদুলি রাখা হয়েছিল সেই আশা বা আকাংখা পুরণ হবে বলে তারা বিশ্বাস করে। যাদের মাদুলি পুরণ হয়না তারা নিজেদের ত্রুটি বলে বিশ্বাস করে এবং পরবর্তী বারের দিন পূর্বের চেয়ে খান-জাহান (রঃ) প্রতি আরও ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে সারারাত আল্লার রহমাত কামনার মধ্যে দিয়ে রাত অতিবাহিত করে যখন সকালে দ্যাখে তাদের রক্ষিত মাদুলিটি পূর্ণ হয়েছে, তখন তাদের চোখে-মুখে যে তৃপ্তির ছাপ ফুটে ওঠে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। কোন কোন মহিলা ভক্তেরা খান-জাহান দীঘিতে গোসল করে ভিজা কাপড়ে পাপুড় গাছের নিচে শাড়ীর আঁচল পেতে বসে খান-জাহানের ওছিলায় আল্লার রহমাত কামনা করে তার মনের আশা পূরণের চেষ্ঠায় বসে থাকে। যতক্ষণ তাদের পাতা আঁচলে কিছু না পড়ে ততক্ষণ তারা এক মনে একধ্যানে বসে থাকে। এরপর ফুল, পাতা, যা কিছু পড়ে সেটাই তাদের আশা পুরণের প্রতিক মনে সে বা তারা অতি ভক্তি সহকারে খাদেমের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার বা ধারণ করে। তাতেই তাদের মুক্তি তারা মনে করে।

অতীতের ন্যায় বর্তমানেও বিদ্যানন্দকাটী খানজাহান দীঘির পাড়ে একজন খাদেম দেখাশুনা ও তত্ত্বাবধান করেন। বর্তমানে খানজাহান দরগার খাদেম বিদ্যানন্দকাটী গ্রামের মিয়াজান দপ্তরীর ছেলে আকরাম আলী দপ্তরী। তিনি এই দরগায় সপরিবারে বসবাস করেন। তার ভাষ্য মতে তিনি ওই দরগার সতের তম খাদেম। আকরাম দপ্তরী তার পুরো পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস করছেন। তার পরিবারের লোক সংখ্যা ছোট-বড় মিলে সতের জন। আকরাম দপ্তরীর বসবাস করা সম্পত্তি যশোর জেলা পরিষদের। খান-জাহান আলীর দীঘিটি এখন আর পুরোপুরি খাস নয়। বিশাল দীঘিটির মাত্র ১.৬২ (এক একর বাষট্টি) শতাংশ জমি খাস। বাকী জমি এস,এ রেকর্ড-এ ব্যক্তি নামে রেকর্ড হয়ে যায়। রেকর্ডকৃত ও বন্দোবস্ত নেওয়া সম্পত্তির ওয়ারেশগণের সংখ্যা সব মিলে প্রায় ৬০ জন। এর মধ্যে শ্রীফলা গ্রামের বারিক খানের পুত্র নাজির খান, বিদ্যানন্দকাটী গ্রামের নওয়াব আলী সানার পুত্র কবিরুদ্দিন সানা, মির্জাপুর গ্রামের আনছার জোয়ারদারের পুত্র রেজাউল জোয়ারদার, একই গ্রামের কেরামত জোয়ারদারের পুত্র জমির জোয়ারদার ও তসির জোয়ারদার, ছেদু মোড়লের পুত্র সফর মোড়ল প্রমূখ। এলাকাবাসীর অভিমত উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের ওয়ারেশগণ অনৈতিক ভাবে খানজাহান নামীয় খাস জমি নিজেদের নামে রেকর্ড বা বন্দোবস্ত নিয়েছে। অনেকে আবার এও বিশ্বাস করেন যে যারা পীর খানজাহানের সংগে এমন বেয়াদপি করেছেন, আল্লাহ তাদের যথাযথ বিচার করবেন।

সতীশ চন্দ্র মিত্র তার যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন প্রতি বছর দোল যাত্রার সময় খান-জাহান(রঃ) দীঘির দরগায় মেলা বসে। তার দেওয়া এই তথ্য সঠিক নয়। খাদেম আকরাম আলী দপ্তরী জানান অতীত হতে একই নিয়মে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ শুক্রবার খানজাহান দীঘির পাড়ে খাঞ্জান দরগায় মেলা বসে। ওই মেলায় শত শত লোক দরগায় উপস্থিত হয়। পীর খান-জাহান(রঃ) ভক্তরা মেলায় সমবেত হয়ে মেলা উৎযাপন করে। এই অনুষ্ঠানের আসেকানরা গরু বা খাসি জবেহ করে খানাপিনা করে। কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাটী খানজাহান দরগা এই এলাকার সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার স্থান। তারা তাদের অন্তরের শ্রদ্ধা বা ভক্তির স্থানে পীর খান-জাহানকে বসিয়ে নিজেদের ভাল-মন্দ, বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখ, শুভ-অশুভ, বসতবাড়ি তৈরী প্রভৃতি শুভ কাজে পীর খান-জাহানের উছিলায় তাদের মঙ্গল হবে এরুপ ধারণা পোষণ করে। একটি ঘটনা থেকে জানা যায় সরফাবাদ গ্রামের নাসির উদ্দিন মোড়লের স্ত্রী জাহানারা বেগম তাদের পুকুর পাড়ের একটি কাঁঠাল গাছ ধীরে ধীরে উপর থেকে শুকিয়ে মারা যাচ্ছিল। জাহানারা বেগম তখন ওই দরগা থেকে একটি দড়ি এনে যে পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়েছিল তার নিচে বেড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল; যে স্থানে বেঁধে দিয়েছিল তার নিচে গাছটি আর মরেনি। সেখান থেকে গাছটি নতুন করে ডালপালা ছেড়ে বেঁচে ওঠে। এখনও গাছটি পূর্বের ন্যায় অবিচল থেকে ফল দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মাষ্টার নাসির উদ্দিন মোড়ল ও তার আত্মীয় প্রতিবেশী আব্দুস সামাদ গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। বহু চিকিৎসার পরও কোন উন্নতি না হওয়ায় শেষে তারা খান-জাহানের দরগায় সব সময় পড়ে থাকতো। সেখান থেকে তারা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে এখন তারা পরিপূর্ণ সুস্থ। এমন অসংখ্য ঘটনা বিভিন্ন লোকের মুখে মুখে ফিরছে। আজও বিভিন্ন বারের দিন লোকজন ফল-ফলাদি, মুরগী, খাসি মানত হিসেবে এখানে উৎসর্গ করে থাকে। উৎসর্গকৃত ওই সকল দ্রব্যাদি ভক্ত ও আসেকানগণ পরিতৃপ্তির সাথে আহার করে থাকে। তাই খান-জাহানের দরগা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য চিরদিন আর্শীবাদস্বরূপ বেঁচে থাকবে।

লেখক পরিচিতি

অধ্যক্ষ, পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ, ডাকঘরঃ পাঁজিয়া, উপজেলাঃ কেশবপুর, জেলাঃ যশোর।
সাংবাদিক ও কলামমিস্ট।
মোবাঃ ০১৭১৮-৬১১৫৫০, ই-মেইলঃ  ruhulamin0655@gmail.com

পত্র প্রাপ্তির ঠিকানাঃ
মোঃ রুহুল আমিন (অধ্যক্ষ), গ্রাম- আলতাপোল (অফিস পাড়া), উপজেলা রোড, উপজেলা মসজিদ সংলগ্ন, ডাকঘর- কেশবপুর, জেলা- যশোর।

You May Also Like