সংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতি

গত ২৬ সেপ্টেম্বর’১৭ মঙ্গলবার, রাত ১১ টা। শরতের চিমটে গরমে অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকার মত বিড়ম্বনা আর নেই। অবশ্য আমাদের মঙ্গলকোটবাসির পক্ষে সেটা কিছু না। আমার মনে হয়, যশোর জেলার সবচেয়ে কম সময় যদি কোন এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে, তবে সেটা মঙ্গলকোট ইউনিয়নে। বিদ্যুৎ এখানে কখন আসতে পারে সেটা স্বয়ং কর্তৃপক্ষও বলতে পারে না। তবে বিদ্যুৎ এলে যে কখন যেতে পারে সেটা আবাল-বৃদ্ধ সবাই বলতে পারে। আমি নাকে তৈল লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকার কায়দা টা জানি না। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের স্মরণাপন্ন হতে মন চাই।

হাতপাখার বাতাস এবং মশার কামড়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চোখ দুটো কখন যে এক হয়ে গেছে বলতে পারি না। হঠাৎ রাত ১১:৪৫ মিনিটে মহা প্রতীক্ষিত বিদ্যুৎ এলে টেলিভিশনের শব্দে সজাগ হলাম। পর্দায় চোখ রাখতেই দেখি জনপ্রিয় এক অভিনেত্রীর উপস্থাপনায় সুনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেল Ntv -তে Miss World Bangladesh 2017 এর প্রতিযোগিতা চলছে। দেখে বুঝলাম এটি একটি নৃত্য প্রতিযোগিতা। ঢালিউড এবং টালিউডের আইটেম গানগুলো নিয়ে নিয়ে একে একে তরুণীদের নাচ চলছে। গান ও পোশাকের অপূর্ব সংকোলন। ছোট ছোট জামা প্যান্টের সাথে  শাড়ীর অবস্থানও হাঁটু ছুঁই ছুঁই। কেউ বাররাণী, কেউ নর্তকী আবার কেউ…!! আমার মত তরতাজা যুবকের ঘুম তাড়াতে এটা কি যথেষ্ট নয়? পলকহীন ভাবে টেলিভিশনের পর্দায় হুমড়ী খেয়ে পড়ে রইলাম। সংক্ষিপ্ত আকারে পরিবেশনের কারনে রাত ১২:১৫ মিনিটের (পরে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দেখা সম্ভব হয়নি) মধ্যে প্রায় ১৫ টা নাচ দেখে ফেললাম।

নাচ বা নৃত্য একটি শিল্প যা দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে রপ্ত করতে হয়।

নাচ বা নৃত্য শব্দটি সাধারণত শারীরিক নড়াচড়ার প্রকাশভঙ্গীকে বোঝায়। এ প্রকাশভঙ্গী শুধুমাত্র মনোরঞ্জন ক্ষেত্রে হলেই হবে না। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ম-কানুন মানলেই কেবল তাকে নাচ বা নৃত্য বলা যায়। অন্য ভাবে বললে, নৃত্যকলার সংজ্ঞা নির্ভর করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নন্দনতত্ত্বিক, শৈল্পিক এবং নৈতিক বিষয়ের উপর। অন্যথা সেটি হয় অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গি।

কিন্তু আমার চোখের সামনে যেটা চলছিল, সেটাকে আমি কোন ভাবেই নৃত্য বলে স্বীকার করতে পারিনি।

২.

প্রত্যেক প্রতিযোগী তার নাচ পরিবেশনের আগে সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু কথা বলছিল এবং নাচ পরিবেশনের পরে উপস্থাপিকা তার (প্রতিযোগীর) রূপ, নাচ, হাসি ও আত্মবিশ্বাসের গুণকীর্তন করছেন। প্রতিযোগী ও উপস্থাপিকার সংক্ষিপ্ত মন্তব্যের ভাষা শুনে খুব কষ্ট পেলাম। প্রত্যেকটি বাক্যে বাংলা এবং ইংরেজি শব্দের যে উচ্চারণ তা সত্যিই আমার পক্ষে বোধগম্য ছিল না। বরাবরই আমি ইংরেজিতে খুব দূর্বল কিন্তু অন্তত বাংলা শব্দ বা বাক্যগুলো বোঝার কথা ছিল। প্রত্যেকটি শব্দের বিকৃত উচ্চারণে সেটা সম্ভব হল না। ইংরেজি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই,“ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সেটা শুদ্ধ এবং অবশ্যই আমাদের মাতৃভাষার পরে হতে হবে।” অর্ধেক বাংলা এবং অর্ধেক ইংরেজি না হয় মেনে নেওয়া যায়। তাই বলে বাংলার অংশটুকু অশুদ্ধ বললে মেনে নেওয়া যায় না। বাঙ্গালি বংশোদ্ভূত বিদেশি হলেও এক কথা। তবে নিরেট বাংলাদেশি ( সন্দিহান) এ সকল প্রতিযোগীর মুখের ভাষা এমন জগাখিচুড়ি হবে জানলে বোধকরি লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলা জন্য ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ত না এবং অকুণ্ঠ ভাবে আত্মবিসর্জন দিত না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। যেমন- লেবু বেশি কচকালে তিতে হয়ে যায়।

এসব লোকদের কি দোষ দেব? এসবের রমরমা অবস্থা তো আমাদের মত রঙ্গরসিক দর্শকের জন্য। মাংসাশী হিংস্র পশুর মতো শিকার সামনে দেখলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। টেনে হিঁচড়ে তার রক্ত মাংস নিঃশেষ না করলেও জিহ্বা দিয়ে লালা ঝরায়। দেশীয় সংস্কৃতিকে গলা টিপে হত্যা করে, অপসংস্কৃতিকে করে তুলেছে মুখরোচক ।

আমরা তালে তাল মিলাতে পছন্দ করি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যেমন অপসংস্কৃতি পালন করতে দ্বিধাবোধ করি না! তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতায় পড়ে কতিপয় দেশীয় সংস্কৃতিও পালন করি! তবে এটাও সত্য যে, “সেই ব্যক্তিত্বহীন, যে সবার সাথে তাল মিলায়! সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক কিন্তু এই ধরনের পরিবর্তন আমাদের জন্য অভিশাপ হবে।।

নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি উন্নয়ন করবো এটা স্বাভাবিক কিন্তু অপসংস্কৃতি ধারন পোষন করবো, এটা কাম্য হতে পারে না।

আসুন বিবেককে জাগিয়ে তুলি। দেশীয় সংস্কৃতির দিকে সুদৃষ্টি দেই! তাহলে সংস্কৃতি তার হারিয়ে যেতে থাকা গৌরব ফিরে পাবে এবং দেশও বিশ্বের দরবারে উপস্থাপিত হবে গৌরবময় সংস্কৃতির নিজস্বতা নিয়ে।

মোঃ রুহুল আমিন
সরকারি এম এম কলেজ, যশোর।
বিষয়ঃ বাংলা (সম্মান), বর্ষ- ২য়
ই-মেইলঃ ruhulamin807@gmail.com

 

You May Also Like