মণিরামপুরের হেরমত আলী ৭১’র রনাঙ্গনের এক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা

আব্দুর রহিম রানা, যশোর ||

৭১’এর রনাঙ্গনের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম হেরমত আলী। তাঁর বাড়ি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মুজগুন্নী গ্রামে। ১৯৬৭ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন তিনি। ৭১’র রনাঙ্গনের যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা হেরমত আলী আজও ভুলতে পারেনি ঘাতকদের নির্মম বুলেটে নিরস্ত্র বাঙালি সৈনিকদের সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি।

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রানের মায়া ত্যাগ করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি ঘাতকদের নির্মম বুলেটে ও নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন। অল্পের জন্য প্রানে বেঁচে যান। সে কথা তিনি স্বাধীনতা প্রাপ্তির সুখে ভুলে গেছেন। কিন্তু তার সহযোদ্ধা বাঙালি সৈনিকদের অস্ত্র জমা নিয়ে বিশ্রামে পাঠানোর কথা বলে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ সেদিন ঘাতকরা চালিয়েছিলো যা স্মৃতি থেকে তিনি আজও ভুলতে পারেননি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনে সাড়া দিয়ে চাকুরির মায়া ত্যাগ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের পর তিনি বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পাকবাহিনী তথা রাজাকারদের বর্বর হত্যাযজ্ঞ তিনি সচক্ষে দেখেছেন। তিনিও ঘাতকদের বুলেট বিদ্ধ হয়ে ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে অল্পের জন্য প্রানে বেঁচে গেছেন।

সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের কাছে ৭১’র বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা বর্ণনা করেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হেরমত আলী। ৭১’র ৩১ মার্চ মেজর হাফিজের নেতৃত্বে যশোরের চৌগাছায় প্রশিক্ষণকালীন একজন বাঙালি ব্রিগেড কমান্ডারের নেতৃত্বে অন্যান্য বাঙালি সৈন্যদের সাথে তিনিও যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করলে তাদের অস্ত্র জমা নিয়ে বিশ্রামে পাঠায় পাকিস্তানি কমান্ডার। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে বাঙালি অ্যাডজুট্যান্ট লে. আনোয়ারের নির্দেশে বাঙালি সৈনিকরা অস্ত্রগারের তালা ভেঙে অস্ত্র বের করতেই তাদের উপর পাকিস্তানি আর্টিলারি থেকে কামানের গোলা ছুড়তে থাকে ঘাতকরা। শুরু হয় বাঙালি সৈনিকদের নিধনযজ্ঞ। প্রায় ২০০ বাঙালি সৈনিক নিহত হন। সে দিনের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি হেরমত আলী।

তিনি বলেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্র নিয়ে শত শত বাঙালি সৈনিক পালানোর সময় যশোরের ক্ষিতিবদিয়া বিলে শত্রু বুলেট এসে লাগে লে. আনোয়ারের মাথায়। রক্তাক্ত নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। শহীদ হন লে. আনোয়ার। সবাই মিলে ধরাধরি করে পাশ্ববর্তী হৈবতপুরে নিয়ে যান তাঁর লাশ। সেখানেই তাঁকে দাফন করে ২৫/৩০জন বাঙালি সৈন্যকে সাথে নিয়ে চৌগাছার ধলদী হাইস্কুলে মেজর হাফিজের সাথে মিলিত হই। সেখানে অপেক্ষমান আরো ৭০/৮০জন সেনাকে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করে টালিখোলা ক্যাম্পে মেজর হাফিজের নেতৃত্বে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হয়। তার কয়েকদিন পর ভারত থেকে বর্তমান জামালপুর জেলার সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশের সময় কামালপুর বিওপির খান সেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দীনের নেতৃত্বে যমুনার তীরের ওই যুদ্ধে শতাধিক খানসেনা নিহত হয়। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দীনসহ ৫-৬ জন মুক্তিযোদ্ধাও ওই যুদ্ধে নিহত হন। সেই যুদ্ধে অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও কোমরে গুলিবিদ্ধ হন হেরমত আলী। তাকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে ৫ ডিসেম্বর রাতে আবারো ফিরে আসেন দেশের মাটিতে। যশোরের চৌগাছার সীমান্তে নায়েব সুবেদার রজব আলীর নেতৃত্বে নিজামপুরে পাকহানাদারদের সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। সে সময় চৌগাছার লক্ষণপুর, গোড়পাড়া, নিজামাপুর বিলে শুধু পানি আর পানি। বিলের ওই পানি ভেঙে অপর প্রান্তে এসে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। বিল পেরিয়ে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। প্রায় ৩০-৩৫ জন জন রাজাকার নিহত হয় ওই যুদ্ধে।

একটি আখক্ষেতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওৎপেতে থাকা রাজাকারদের হাতে আচমকা ধরা পড়েন হেরমত আলী। ধারালো ছুরি দিয়ে দু’পায়ের রগ কেটে দিয়ে মৃত ভেবে তাকে আখক্ষেতেই ফেলে রেখে চলে যায় রাজাকাররা। ভাগ্যের জোরে সেদিনও বেঁচে গেলেন তিনি। পরদিন দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হিসেবে যশোর ক্যান্টনমেন্টের যুদ্ধ শিবিরে পাঠানো হলো তাকে। পুনরায় চাকরিতে যোগ দিলেন। কিন্তু বিধিবাম।

স্বাধীনতার স্বাদ পেতে না পেতেই ৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত এ দেশীয় পাকসেনাদের দোসররা। এ হত্যাযজ্ঞ মেনে নিতে পারেননি হেরমত আলী। তাই এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার দায়ে অনেক সৈনিক ন্যায় তাকেও চাকুরিচ্যুত করা হয়। স্বাধীনতার এতটা বছর পেরিয়ে গেলেও বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধকালীন সময়ের ক্ষত-বিক্ষত দেহ। তবে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানি পেলেও যুদ্ধাহত সুযোগ-সুবিধা থেকে তিনি আজও বঞ্চিত রয়েছেন।

You May Also Like