কৃষি জমি দখল করে কেশবপুরে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা || প্রতিবাদকারীরা হামলা-মামলার শিকার

কেশবপুর নিউজ ডেস্ক  ।।

যশোরের কেশবপুরে সরকারের নীতিমালা উপেক্ষা করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ ইটভাটা। এসব ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, নষ্ট করা হচ্ছে কৃষি জমি, উজাড় হচ্ছে বনভূমি। ইটভাটা নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কৃষকরা ভাটা মালিক কর্তৃক হামলা, ষড়যন্ত্রমূলক মামলার শিকারসহ নানা ভাবে হয়রানী হচ্ছে বলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।

জানা গেছে, যশোরের কেশবপুর উপজেলায় মাত্র ৩টি ইটভাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এর বাইরে আরও অন্তত ১২টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। যেখানে নিয়ম বলতে কিছুই নেই। গত ২ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকল ইট ভাটার মালিকদের কাগজপত্র নিয়ে তার দপ্তরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। ওই দিন ১৫ জন ভাটা মালিকের মধ্যে ১২ জন হাজির হন। উপজেলার সাতাবাড়িয়া গ্রামের রহমান ব্রিকস, একই গ্রামের আলম ব্রিকস ও দোরমুটিয়া গ্রামের কেশবপুর ব্রিকস পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

কেশবপুরে দিন দিন যেমন ডাঙা জমিতে বাড়ছে ইটের ভাটা তেমনি নিচের জমিতে বাড়ছে মাছের ঘের। এতে শস্য নিবীড়তা কমার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন-২০১৩ এর ৮ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা; কৃষি জমি, পরিবেশ বিপর্যয়, ফসলের ক্ষতি সাধন, ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগান দখল করে কোন ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। ভাটা মালিকগণ এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক ইটভাটা স্থাপন করে চলেছেন।

গত বছর উপজেলার বারুইহাটি চৌরাস্তা মোড়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ৩ ফসলী জমি গ্রাস করে রোমান ব্রিকস নামের একটি ইট ভাটা নির্মাণ হয়েছে। এ ইটভাটা নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় কৃষকরা ভাটা মালিক কর্তৃক হামলা, ষড়যন্ত্র মূলক মামলার শিকার নানা ভাবে হয়রানী হচ্ছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকালে শতাধিক কৃষাণ, কৃষাণী থানায় অবস্থান নিয়ে ভাটা মালিকের বিচার দাবী জানান।

পরে কৃষক নূর আলী মোড়ল বাদী হয়ে ৫ জনসহ অজ্ঞত ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। থানার অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ শাহজান আহম্মেদ বলেন, অভিযোগ পেয়েছি সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ছাড়া উপজেলার বায়সা কালিবাড়ি মোড়ে ৮/১০ বছর আগে মনিরামপুরের এক ভাটা মালিক গোল্ড ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা গড়ে তুলেছেন। যেখানে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। নষ্ট করছে ফসলি জমি। এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটির টপ সোয়েল কেটে ইট তৈরীর জন্যে ডিবি করে রাখা হয়েছে। এ ভাটার পূর্বে অনুমতি ছিল। বর্তমানে কোন কাগজ পত্র নেই। ২/৩ বছর আগে এ ভাটার ১০০ গজ দূরে গাজী ব্রিকস নামের আরও একটি ইটভাটা গড়ে তুলেছেন কেশবপুর শহরের আরমান গাজী। এরও কোন কাগজপত্র নেই। পৌর এলাকায় কোন ইটভাটা করার নিয়ম না থাকলেও শহরের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে ১৫/১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে নজরুল ইসলাম খান গড়ে তুলেছেন খান ব্রিকস। এ ভাটার নবায়নও নেই আবার অনুমোদনও নেই। গত ২ বছর ধরে শহরে ভোগতীনরেন্দ্রপুর গ্রামে ৩ ফসলি জমি দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে জামান ব্রিকস। এরও কোন কাগজপত্রও নেই। ৪/৫ বছর আগে উপজেলার বেগমপুর গ্রামে ২ ফসলি জমি জবর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে রিপন ব্রিকস। কাগজপত্র ছাড়াই চলছে ভাটাটি। সাতবাড়িয়া বাজারের ১০০ গজ দূরে বসতিপূর্ণ এলাকার ৩ ফসলি জমি দখল করে গত ২ বছর ধরে সুপার ব্রিকস নামে একটি ভাটা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আগরহাটি গ্রামে কাগজপত্র ছাড়াই চলছে প্রাইম ব্রিকস। এছাড়া সন্ন্যাসগাছা গ্রামের বিবি ব্রিকস-১ ও বিবি ব্রিকস-২ মালিকের কাছে কাগজপত্র চাওয়া হলেও তারা আজও উপজেলা প্রশাসনের কাছে তা সরবরাহ করেনি। এরমধ্যে অধিকাংশ ভাটা মালিক মৌখিক অনুমতি নিয়ে বছরের পর বছর ইট উৎপাদন ও বিক্রি করে চলেছেন। গত বছর রাবেয়া ব্রিকম ও হাসান ব্রিকসের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। তারা এ বছরের শুরুতেই আবার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসি ফুসে উঠেছেন। যত্রতত্র ইটভাটা বন্ধের দাবিতে ইতোমধ্যে কেশবপুরের শ‘শ নারী পুরুষ কেশবপুর শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহদেব চন্দ্র সানা বলেন, এ উপজেলায় হঠাৎ করে বেশ কিছু ইট ভাটা গড়ে উঠার কারণে ফসলি জমি, গাছপালা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরে ইটভাটার ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের মতামত নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তারা তা কখনও নেয় না।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা মিজানূর রহমান বলেন, যে সমস্ত ভাটার কাগজপত্র নেই তাদের ১ মাসের সময় দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে যারা কাগজপত্র সরবরাহ করবে তারাই ভাটা চালাতে পারবে।

You May Also Like