রক্ষণশীল সমাজের নারী শিক্ষার অগ্রদূত যশোর সরকারি মহিলা কলেজ

তাসনিয়া আফরোজ ইউনা ||

‘আমরা করব জয় একদিন’, মাত্র ৪৭ জন শিক্ষার্থীর সে পণ শুধু বাস্তবায়নই নয়, জন্ম দিয়েছে হাজারো রূপকারের। যারা বিভিন্ন সেক্টরে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে দেশ সেবা করে যাচ্ছেন। আলোকিত করছেন নিজেকে, অন্যকেও।

অথচ তাদের শুরুটা ছিল চরম বৈরী পরিবেশের মধ্য দিয়ে। যখন মেয়েদের শিক্ষাকে অনেকটাই বক্র চোখে দেখা হত সমাজে। বৈরী সে সময়ে নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে ১৯৬৫ সালে যশোরে স্থাপন করা হয় মহিলা কলেজের। শুরুতে অবশ্য অনেকটাই ম্রিয়মান ছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আসে বিদ্যাপীঠটি।

ভাল ফলাফল, কঠোর অনুশাসন, নির্বিঘ্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে অনেকেই তাদের সন্তানকে বিদ্যাপীঠটিতে ভর্তি করতে আগ্রহী হন। ধীরে ধীরে দূর-দূরান্তেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে যশোর মহিলা কলেজের নামডাক। এরই মাঝে প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। সেই থেকে যশোরের নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে সরকারি মহিলা কলেজ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এ বিদ্যাপীঠটিতে বর্তমানে সাত হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। যারা শুধু যশোরেরই অধিবাসী নন বরং যশোর ছাড়াও ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলার অনেক শিক্ষার্থীও এ কলেজে লেখাপড়া করছে।

মোট ২.৮৯ একর জমির ওপর নির্মিত বিদ্যাপীঠটিতে ৫টি বহুতল একাডেমিক ভবন, শিক্ষক মিলনায়তন ও ৩টি ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে। এছাড়াও খেলাধূলার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। শহীদ মিনার, স্বাধীনতা ভাস্কর্য আর শিক্ষার্থীদের জন্য আছে মনোরম ফুল বাগান। বর্হিবিশ্বের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমানতালে এগিয়ে নেয়ার জন্য তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষা বিকাশে ২০টি কম্পিউটারের সমন্বয়ে একটি আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব।

৭০ জন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে চালু আছে ১৪টি বিভাগ। শুধু লেখাপড়াতেই নয় সামাজিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও বিদ্যাপীঠটির শিক্ষার্থীরা রেখে চলেছে ভূয়সী ভূমিকা। উন্নত বিশ্বের সাথে শিক্ষার মান সমন্বয় করতে ইতোমধ্যেই যশোর সরকারি মহিলা কলেজের পাঠ্যসূচি ডিজিটাল কন্টেন্টে তৈরি করা হচ্ছে। চলছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যক্রম। যার ৬০ ভাগ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালানোর জন্য রয়েছে ১৫টি প্রজেক্টর ও সমপরিমাণ কম্পিউটার, ল্যাপটপ।

বিদ্যাপীঠটির অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এম হাসান সরোওয়ার্দী বলেন, সরকারের শিক্ষানীতি অনুসরণ করার পাশাপাশি ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন এবং এসডিজি লক্ষ্য পূরণে যশোর সরকারি মহিরা কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা একযোগে কাজ করছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নেয়া এবং তার বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছেন সকলেই।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই ক্লিন ও সেভ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা, অভিভাবক সমাবেশ, ফলাফল মূল্যায়ন এবং বিশুদ্ধ পানি সাপ্লাই শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ এইচএসসিতে ৭১ ভাগ এবং স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্সে ৯০ ভাগ সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে শিক্ষার্থীরা।

অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে চলা এ বিদ্যাপীঠটির যেমন অনেক প্রাপ্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে অপ্রাপ্তিও। শিক্ষক, ক্লাসরুম ও পরিবহন সংকটে অনেক ভোগান্তীই পোহাতে হচ্ছে বিদ্যাপীঠটিকে।

এক নজরে যশোর সরকারি মহিলা কলেজ

প্রতিষ্ঠাকাল : ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫।

জাতীয়করণ: ১মার্চ ১৯৮০।
জমির পরিমাণ : ২.৮৯ একর।
অনুষদ সংখ্যা : ৪টি।
বিভাগ সংখ্যা : ১৪টি।
স্নাতক কোর্স চালু : ৯টি বিষয়। ( বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলাম শিক্ষা এবং ভূগোল ও পরিবেশ )।
মাস্টার্স কোর্স চালু : ৭টি বিষয়। ( বাংলা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং ভূগোল ও পরিবেশ )।
সর্বমোট ছাত্রী সংখ্যা : ৭০০০ জন।
প্রশাসন পদ সংখ্যা : ২টি।
শিক্ষকের পদসংখ্যা : ৭৬টি ( শূণ্য ৬টি )।
গ্রন্থাগারিক পদসংখ্যা : ০১টি ( শূণ্য )।
প্রদর্শকের পদসংখ্যা : ৪টি ( শূণ্য ২টি )।
সহকারি গ্রস্থাগারিক : ০১টি।
শরীর চর্চা শিক্ষক পদসংখ্যা : ১টি ( শূণ্য )।
৩য় শ্রেণীর কর্মচারী পদসংখ্যা : ০৭টি ( শূণ্য-২টি )।
৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদসংখ্যা : ১৬টি ( শূণ্য-৮টি )।
মাস্টাররোল কর্মচারীর সংখ্যা : ৪৭ জন।
ছাত্রী নিবাস : ভবন ৩টি। সিট সংখ্যা : ৪৯০টি।
ভবন : ৫টি। শ্রেণী : ২৫টি।
বহিঃ ক্রীড়া ব্যবস্থা : ভলিবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন। আন্তঃ ক্রীড়া ব্যবস্থা : কেরাম, টেবিল টেনিস, দাবা। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা : গান, নৃত্য, কবিতা, কৌতুক, নাটক।

কম্পিউটার ল্যাব : ১টি। কম্পিউটার: ২০টি।
কলেজ পরিবহন ব্যবস্থা: ০১টি বাস।
ক্যান্টিন: ০১টি।
কেন্দ্রিয় লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা: ১৩,১৪২টি।
শহীদ মিনার: ০১টি।
স্বাধীনতা ভাস্কর্য: ০১টি ( প্রদীপ্ত স্বাধীনতা )।
প্রাণি মিউজিয়াম: ০১টি।
ফুলের বাগান: ০১টি।
বিপন্ন উদ্ভিদ কর্ণার: ০১টি।

এছাড়াও নিয়মিতভাবে কলেজ ম্যাগাজিন, সাহিত্য ও দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাছাড়া চালু আছে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট এবং রেডক্রিসেন্ট কার্যক্রম।

You May Also Like