মধুসূদন মানস ও তার সৃষ্টি || অধ্যক্ষ রুহুল আমিন

“বঙ্গবাণীকে গম্ভীর স্বর নির্ঘোষ মন্দ্রিত করে তোলবার জন্য সংস্কৃত ভাণ্ডার থেকে মধুসূদন নিঃসকোচে যেসব শব্দ আহরণ করতে লাগলেন সেও নতুন, বাংলা পয়ারের সনাতন সমদ্বিভঙ্গ আল ভেঙ্গে দিয়ে তার উপর অমিত্রাক্ষরে যে বন্যা বইয়ে দিলেন সেও নতুন, আর মহাকাব্য খণ্ড করে রচনার যে রীতি অবলম্বন করলেন, তাও বাংলা ভাষায় নতুন”– এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। আমরা যদি কবির সৃষ্টি সম্বন্ধে যথার্থই জানতে চাই, তাহলে তাঁর কবি মানসের পাশাপাশি স্থান, কাল, পাত্র অবস্থান জানতে হবে। অন্যাথায় তাঁর মহান সৃষ্টি সম্পর্কে অস্পষ্টতা থেকে যাবে।

যশোর জেলার সাগরদাঁড়ী গ্রামে প্রসিদ্ধ দত্ত বংশে ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারী মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা- রাজনারায়ন দত্তের বংশ ও খ্যাতি দুই-ই ছিল। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের লীলাভূমি কপোতাক্ষ তীরে সাগরদাঁড়ী গ্রাম কিশোর কবিকে প্রভাবিত করে। এ সময়ে মা ও দিদিমার কাছে রামায়ন ও মহাভারতের কাহিনী শুনতে শুনতে তাঁর কোমল মন করুণ রসে ভেসে যেত। কৈশোরের গ্রাম্য স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি যখন হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন, সে সময়ে দেশে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও কৃষ্টির বন্যা এসেছে। ডিরোজিও, রিচার্ডসন প্রভৃতি ইংরেজ অধ্যাপকগণের শিক্ষায় বাঙ্গালী তরুণ সম্প্রদায় ইংরেজি কৃষ্টির অন্ধ অনুকরণ শুরু করে। মধুসূদনের ব্যক্তিগত জীবনেও এই অন্ধ অনুকরণের যে প্রচেষ্টা দেখা যায় তা তার সাহিত্যিক জীবন হতে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না।

মধুসূদন বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে সত্যিকার বিপ্লবী কবি। অসাধারণ চাঞ্চল্যে এবং জীবন সচেতনতায় বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন প্রাণময়তা ও সজীবতার সঞ্চার করেন। রচনাভঙ্গিতে, বক্তব্যে এবং সমস্তকিছুর আশ্চর্য শিল্পকুশলতায় তিনি সাহিত্যের গতি পরিবর্তন করেন ও তার পরিসর প্রসারিত করেন। তিনি বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট প্রবর্তন করেন। বাংলার প্রথম আধুনিক কমেডি ও ট্রাজেডির স্রষ্টাও তিনি। মধুসূদনের কাব্য সাধনার বিদেশী সাহিত্যের প্রাণধর্ম নতুন সুর মূর্ছনায় ঝংকৃত হয়েছে। তাঁর ‘মেঘনাদ বধ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য। এই কাব্য রচনায় ভারতীয় পুরাণ ইতিহাস, রামায়ণ, মহাভারত হতে উপাদান সংগ্রহ করলেও কাহিনী নির্মাণ, চরিত্রসৃষ্টি এবং শব্দ প্রয়োগের কলাকৌশাল তিনি গ্রহণ করেছেন হোমার-ভার্জিল-দান্তে ও মিলটন হতে।

মধুসূদনের কাব্য তাঁর জীবন হতে পৃথক নয়। বিদেশী সাহিত্যের উদ্দীপনা, প্রাণময়তা, দীপ্তি ও চাঞ্চল্য তাঁর সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে প্রাণের প্রাচুর্যে। নিজের জীবনের চরম উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্যে তিনি বিদেশী জীবন ও সংস্কৃতিকে পূর্ণ শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছিলেন। শৈশবকাল হতেই দেশজ হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি তাঁর তীব্র ঘৃণা ছিল। এ ঘৃণার প্রকাশ্য পরিচয়স্বরূপ তিনি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। ইংরেজী রমণীকে বিবাহ করা ও উংরেজি ভাষার কাব্য রচনা করা তাঁর বিরূপ মনোবৃত্তির আর একটি পরিচয়।

মধুসূদনের জীবনে শান্তি ও সুখ ভোগ ছিল না। উচ্চাশা ও বিশৃঙ্খল জীবনযাপনই তাঁর সর্বনাশের কারণ। বাল্যকালেই তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ইংরেজি কবিতা লিখে পাঠাতেন। ইউরোপীয় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাধকদের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ জন্মেছিল। খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে তিনি বিশপস কলেজে ভর্তি  হলেন এবং বাংলা, ইংরেজি, ফারসী, সংস্কৃত, তামিল, তেলেগু, ল্যাটিন, গ্রীক, হিব্রু, ফরাসী, জার্মান ও ইটালিয়ান এই বারটি ভাষা আয়ত্ত করেন। ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে মধুসূদন মাদ্রাজে গমন করে সেখানে Madras Circulator, Madras Spectator  প্রভৃতি সংবাদপত্র সম্পাদনা করে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। এই সময় তিনি  Captive Lady  কাব্য রচনা করেন। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত থাকাকালে তিনি রেভেকা ম্যাকটাভিস নামক এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করেন এবং তার গর্ভে মধুসূদনের ৪ টি সন্তান হয়। এর পর তিনি মাদ্রাজ কলেজের জনৈক অধ্যাপকের কন্যা হেনরিয়েটাকে বিয়ে করেন।

বাংলা সাহিত্যের সংগে মধুসূদনের সম্পর্ক ঘটে আকস্মিকভাবে। আট বছর মাদ্রাজে অবস্থানের পর ১৮৫৬ সালে তিনি কলিকাতায় আসেন। ১৮৫৮ সালে তিনি রামনারায়নণ তর্করত্মের ‘রত্নাবলী’ নাটক অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। কলিকাতায় তখন প্রবলভাবে নাট্য আন্দোলন শুরু হয়। তিনি প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের নিয়ম রীতি ত্যাগ করে পাশ্চাত্য রীতিতে ‘শমিষ্ঠা’ নাটক রচনা করেন। ১৮৫৯ সালে গ্রীক উপাখ্যান অবলম্বনে ‘পদ্মাবতী’ নাটক রচনা করেন। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ নামে তিনি দু’টি সামাজিক প্রহসন রচনা করেন। প্রথমটিতে তথা কথিত আচারনিষ্ঠ প্রাচীনপন্থী হিন্দুদের শ্লেষ আছে। দ্বিতীয়টি ইয়াং বেঙ্গলের উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের বিপথ গমনের চিত্র বিদ্যমান।

মধুসূদনের কাব্য সাধনার সর্বাপেক্ষা ফলপ্রসূ সময় হচ্ছে ১৯৬১- ৬২ সাল। এই অল্প সময়ের মধ্যে ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য, ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক, ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য, ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তিলোত্তমা’র অংশ বিশেষ প্রকাশিত হয়। কবির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য। গ্রীক আদর্শে রচিত এই মহাকাব্যটিতে কবি গ্রীক কাব্যের সৌন্দর্য ও অসাধারণ দীপ্তিকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। সংস্কৃতি সাহিত্যের কাছে মধুসূদনের ঋণ উপাখ্যানগত কিন্তু গ্রীক সাহিত্যে ও ইউরোপীয় সাহিত্যের কাছে তার স্টাইল বা রচনা শৈলীগত। কবির জীবনোপলব্ধির পূর্ণ পরিচয় কাব্যটির শ্রেষ্ঠত্বের আর একটি কারণ। এই কাব্য রচনায় হোমারের ‘ওডিসি ও ইলিয়াদ’ ভার্জিলের ‘ইনিদ’, দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ এবং মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’র প্রভাব পড়েছে।

ইটালীয় কবি ওভিদের কাব্যের অনুকরণে রচিত মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। কাব্যটিতে অমিত্রাক্ষরের পূর্ণ পরিণতি ঘটেছে। ভাষার গাম্ভীর্যে যতি ও ছন্দের বৈচিত্র্যে বীরাঙ্গনা মেঘনাদ বধ অপেক্ষাও পরিণত সৃষ্টি। ইংরেজি কাব্য ব্লাঙ্গভার্স সৃষ্টিতে মার্লোর যে কৃতিত্ব বাংলা কাব্যে মধুসূদনের কৃতিত্ব তা অপেক্ষা অধিক। মার্লো ব্লাঙ্গভার্সের পূর্ণরূপ দিতে পারেনি। কিন্তু মধুসূদনের বীরাঙ্গনা কাব্য অমিত্রাক্ষরের পূর্ণরূপ পেয়েছে। বীরাঙ্গনা কাব্যে জীবনের প্রকাশ অনিবার্যভাবে ঘটেছে। প্রতিটি পত্রের শুরুতে নাটকীয় ভঙ্গি পাঠকের হৃদয়কে আপ্লুত করে। কাব্যটিতে বাঙ্গালী জীবনের আশ্বাস, আনন্দ, পারিবারিক বন্ধন, নির্ভরতা এবং বেদনাবৃত্তির পরিচয় আছে। এ কাব্য প্রাচীন পুরাণের দেবকল্প নর-নারী নরকল্পতা লাভ করেছে। উজ্জ্বল অঙ্গভরণ, শোভা এবং সৌন্দর্য সত্ত্বেও তারা বাঙ্গালী জীবনের অভীন্সা এবং আনন্দ নিয়ে লৌকিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ও স্নিগ্ধতাকেই ঘোষণা করেছে। পিতার মৃত্যুর পর প্রচুর অর্থের অধিকারী হয়ে মধুসূদন জীবন ক্ষেত্রে উচ্চতর প্রতিষ্ঠার আশায় ব্যরিষ্টারী পড়ার জন্য ১৮৬২ সালে ইংল্যান্ড  যান। ফ্রান্সের ভার্সেলস নগরে থাকার সময় তিনি চতুর্দশপদী কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং ১৮৬৬ সালে এগুলি ‘চতুর্দশ পদী’ কবিতাবলী নামে প্রকাশিত হয়। ইটালী কবি ‘প্রেত্রার্ক’কের অনুকরণে চৌদ্দপঙক্তির পরিধির মধ্যে একটি ভাবকে সম্পূর্ণতা দান করা কবির পক্ষে কম কৃতিত্বের কথা নয়। গ্রন্থটিতে মধুসূদনের অপূর্ব মাতৃভূমি প্রীতির পরিচয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ পেয়েছে। আইন ব্যবসায় তিনি যথেষ্ঠ উপার্জন করতে পারেননি। সহায়-সম্বলহীন রোগাক্রান্ত কবি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ১৮৭৩ সালে ২১ জুন আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে প্রাণত্যাগ করেন। শেষ বয়সে তিনি ‘মায়কানন’-নামে একটি নাটক এবং ‘হেকটর বধ’ নামে একটি গদ্যকাব্য লেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অভাবের তাড়নায় কোনটাই শেষ করতে পারেননি।

মধুসূদনের সাহিত্য সৃষ্টির পর বাংলা সাহিত্য এক নতুন পথে অগ্রসর হয়েছে এবং অশ্লীল ও কদর্য সাহিত্য সৃষ্টির চিরাচরিত প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। এতদিন বাংলা সাহিত্যকে লোহার বেড়ীর মত শিকল পরানো ছিল, মধুসূদনের স্পর্শে তা যেন ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। বাংলা সাহিত্য পেল মুক্তির স্বাদ।

লেখক পরিচিতি

মোঃ রুহুল আমিন

অধ্যক্ষ, পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ, ডাকঘরঃ পাঁজিয়া, উপজেলাঃ কেশবপুর, জেলাঃ যশোর।
সাংবাদিক ও কলামমিস্ট।

মোবাঃ ০১৭১৮-৬১১৫৫০, ই-মেইলঃ  ruhulamin0655@gmail.com

পত্র প্রাপ্তির ঠিকানাঃ 

মোঃ রুহুল আমিন (অধ্যক্ষ), গ্রাম- আলতাপোল (অফিস পাড়া), উপজেলা রোড, উপজেলা মসজিদ সংলগ্ন, ডাকঘর- কেশবপুর, জেলা- যশোর।

You May Also Like