কেশবপুরে পানি নিস্কাশনের সরকারী খালগুলো ঘের মালিকদের দখলে || এবারও বন্যার আশংকা

জি.এম.এম. কেশবপুর (যশোর) ||

যশোরের কেশবপুর উপজেলায় বন্যার পানি নিস্কাশনের অধিকাংশ সরকারী খালগুলো ঘেরমালিকদের অবৈধ দখলে থাকায় এবারও ভয়াবহ বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমের আগেই খালগুলো উদ্ধার ও নদনদী খনন করে দ্রুত পানি নিস্কাশনের দাবি জানিয়েছেন বন্যা কবলিত কেশবপুরবাসী।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, বন্যা কবলিত এ উপজেলায় কাগজে কলমে ১৬৩টি খালের কথা উল্লেখ থাকলেও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্যে ১৫টি সরকারী খালের সন্ধান মিলেছে, যার অধিকাংশই ঘের মালিকদের দখলে। হরিহর, বুড়িভদ্রা নদী ও  কপোতাক্ষ নদের দুকূল দখল হতে হতে সরু ও পলিভরাট হওয়ায় পানি নিস্কাশনের গতি রুদ্ধ হয়ে প্রতি বছর কৃত্রিম বন্যায় সর্বশান্ত হচ্ছে এ উপজেলার নিম্ন আয়ের মানুষ।

উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত খালগুলোর মধ্যে পাঁজিয়া ইউনিয়নের হদ খাল (৩কি.মি.) মাস্টার মনিরুল ইসলাম, ঘাঘা-হদের মধ্যবর্তী খাল সাবেক মেম্বার বিশ্বনাথ, মোস্তফা ও রশিদ বিশ্বাস,  পৌরসভার মূলগ্রাম-মধ্যকূলের বিলবলধালী ও টেপোর খাল সুলতান ও বাবু, বাঁকাবর্শীর বিল গরালিয়ার খাল ও দু’পাশ প্রায় ৩কি.মি. ভেড়ী হিসেবে দখল করছে বুলু বিশ্বাস, সেলিমুজ্জামান আসাদ, চান, মৃনাল, কামরুল বিশ্বাস, পদ্ম বিল, কাকলেতলা ও ধর্মপুর-ফতেপুর খালের প্রায় ২ কিঃমিঃ কামরুল বিশ্বাস,  কাদারবিলের নেহালপুর খালের কিছু অংশ নজরুল ইসলাম, মহাদেবপুর বিল সংলগ্ন খালটির আংশিক পৌরসভার ভোগতি গ্রামের মুক্তার আলী, পাঁচপোতা বিলের মঙ্গলকোট-বাদুড়িয়া থেকে হিজলডাঙ্গা পর্যন্ত ৩কিঃমিঃ খাল মঙ্গলকোট এলাকার মহসিন, বুড়ুলি ও কানাইশিষের খালের প্রায় ৪ কিঃমিঃ  ঐ এলাকার কাদের মেম্বারসহ ২০ জন দখল করে মাছচাষ করে আসছে।

এছাড়া হাড়িয়াঘোপ এলাকার হাজুয়ার বিল, কাটাখালীর বিল খুকশিয়া, বিষ্ণুপুর বিলসহ ছোট বড় অনেক খাল স্থানীয় প্রভাবশালী ঘের মালিকরা অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন। সম্প্রতি, বিল বোয়ালিয়া সংলগ্ন খালটি দৈনিক আমাদের সময়ের প্রকাশক এস.এম. বকস্ কল্লোল এর প্রচেষ্টায় জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন ঘের মালিক আসাদের দখল থেকে মুক্ত করেছেন।

সরকারী খাল দখলের বিষয়ে পৌরশহরের ঘের ব্যবসায়ী সেলিমুজ্জামান আসাদ বলেন, বর্তমানে আমার কোন ঘেরের ভেতর সরকারী খাল নেই।
ঘের ব্যবসায়ী মঙ্গলকোট ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আব্দুল কাদের সরকারী খাল দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, হাজী মোঃ মোহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্টের ৬২সালের রেকর্ডকৃত মালিকানাধীন বুড়ুলী খালটি খুলনা জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে প্রতিবছর লীজ নিয়ে আমিসহ প্রায় ২০জন মাছচাষ করে আসছি। এছাড়া অধিকাংশ ঘেরমালিকরা দখলের কথা অস্বীকার করে ডিসিআর কেটে মাছচাষের কথা জানান। কিন্তু ভুমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কোন সরকারী খাল ডিসিআর দেয়ার বিধান নেই।

খুলনা-যশোর পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি মহির উদ্দীন বিশ্বাস কেশবপুর উপজেলা বন্যাকবলিত হওয়ার কারন হিসেবে জানান, উপজেলায় প্রবাহিত হরিহর, বুড়িভদ্রা নদী ও কপোতাক্ষ নদে পলি ভরাট, আভ্যন্তরীন খাল ভরাট ও দখল, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা সহস্রাধিক ঘেরে শুকনা মৌসুমে ডিপটিউবওয়েল দিয়ে পানি ভর্তি করায় বর্ষা মৌসুমে ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি, ঘেরের ড্রেনেজ রুট অত্যন্ত সরু ও পানি নিস্কাশনের পথে লোহার গ্রীল দিয়ে আটকে রাখা। শুধু বন্যা নয়, আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে বৃষ্টি হয়, খাল দখলের কারনে দ্রুত পানি নিস্কাশন না হওয়ায় বোরো ফসলে বিলম্ব,  খরচ বেশী এবং উৎপাদনও কম হয়। এ সময় উপজেলার বিল গরালি, বলধালী, টেপো, বুড়ুলি, পদ্ম, কাদা, বোয়ালিয়াসহ নেহালপুর ও অন্যান্য স্লুইস গেটে ঘের মালিকরা পানি আটকে রাখার ম্বার্থে গেটে অতিরিক্ত গ্রীল, পুরু পলিথিন অথবা মাটি দিয়ে আটকে রাখে (যা বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না), এভাবে পানি প্রবাহ শ্লথ ও নিস্কাশনে বিলম্ব হয়, যা বন্যার অন্যতম কারণ।

তিনি আরও জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমের আগে নদী ও সরকারী খালগুলো দখলদারদের কবল থেকে উন্মুক্ত ও খনন করা না হয়, তবে গতবারের থেকে এ উপজেলায় আরও ভয়াবহ বন্যার আশংকা রয়েছে।

এ বিষয়ে কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ সাইদুর রহমান জানান, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা শত শত ঘেরে খাল দখল এবং নদনদীতে পর্যাপ্ত পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় প্রতিবছর বন্যা এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুমের আগেই প্রত্যেকটি সরকারী খাল দখলমুক্ত করা হবে।

You May Also Like