শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে শ্রীলংকাকে হারিয়ে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে বাংলাদেশ

নাহিদ ইসলাম ||

শ্রীলংকার ৭০ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত তিন জাতির টি-২০ টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের সমীকরণ দাঁড়িয়েছিল ফাইনালে ভারতের মোকাবিলা করতে হলে জিততেই হবে। অঘোষিত সেমি-ফাইনালে রূপ নেওয়া ম্যাচটি চরম নাটকীয়তায় রুদ্ধশ্বাস ছড়িয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ইনিংসের ১১৯ তম বলে, জিতেছে বাংলাদেশ।

আপত দৃষ্টিতে ফলাফলে বাংলাদেশ বিজয়ী, ১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতের মোকাবিলা করবে; কিন্তু অঘোষিত সেমি-ফাইনালের বৈতরণী পার হওয়া ম্যাচের প্রতিবেদন লিখতে বসার পূর্বে চোখ বুলিয়ে নিতে হচ্ছে বিশেষণের তালিকায়। এ ম্যাচের মহিমা পুরোপুরি বর্ণনা করতে দ্বিধান্বিত হয়ে বারবার চোখ রাখতে হবে মানানসই বিশেষণটি প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যবহার করতে।

বাংলাদেশ-শ্রীলংকা-অষ্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ-শ্রীলংকা বিমান ভ্রমণ চক্রে আঙ্গুলের ইনজুরি কাটিয়ে সফরকারী দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ২৪ ঘন্টা না পেরোতেই টস করতে নেমে জয়ী অধিনায়ক সাকিব আল হাসান কোন সংশয় ছাড়াই বোলিং এর সিদ্ধান্ত নেন।

সাহসী সেনানীর মত প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে যেন মুখিয়ে ছিলেন, করলেন ইনিংসের প্রথম ওভার। বিগত ম্যাচগুলোতে বোলিং-এর যে জায়গাটিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ, সেই দ্রুত প্রতিপক্ষের ব্যাটিং দুর্গে আঘাত হানার কাজটি করলেন সাকিব নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় ওভারেই।

এরপর কাটার বয় মুস্তাফিজের জোড়া আঘাত, মেহেদী মিরাজের ঘুর্ণিতে নাস্তানাবুদ হয়ে ৮.১ বলে শ্রীলংকার ৫ম উইকেট পতনের পর এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা টাইগারদের সহজ জয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করছে। কিন্তু স্বপ্নের পথে আততায়ীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় লংকার একাদশের দুই পেরেরা (কুশল-থিসারা), গড়েন ৯৭ রানের কাব্যিক পার্টনারশীপ। নির্ধারিত ২০ ওভারে সর্বসাকুল্যে শ্রীলংকা সংগ্রহ করে ১৫৯ রান।

শ্রীলংকার বিরুদ্ধে গত ম্যাচে এভারেষ্ট সম উচ্চতা ডিঙ্গিয়ে ২১৫ তাড়া করে জয়ের দগদগে স্মৃতি নিয়ে ব্যাট করতে নামেন তামিম-লিটন। নিজের ব্যাটিং শৈলী প্রদর্শণের জন্য পরবর্তী ম্যাচের প্রতীক্ষায় রেখে শূণ্য রানে বিদায় লিটন দাসের। দীর্ঘদিন পর ওয়ান ডাউনে নেমে ভালো ইনিংসের আশা জাগিয়েও ব্যর্থ সাব্বির।

তরুণ তুর্কিদের ব্যর্থতার প্রাথমিক পর্ব সামলিয়ে সাবলীলভাবে রান করতে থাকেন মিষ্টার ডিপেনডেবল তামিম ইকবাল ও রান মেশিন মুশফিক। কিন্তু জয় থেকে ৬৩ রান দূরে মুশির বিদায়ের পর পথ হারায় বাংলাদেশ। তাঁর পদাঙ্গ অনুসরণ করে একে একে ফিরে যায় তামিম, সৌম্য, সাকিব, মিরাজ। অপর প্রান্তে যোগ্য সঙ্গীর প্রত্যাশা করে ক্লান্ত মাহমুদউল্লাহ যখন জয়ের বন্দরে নোঙ্গর করা নাবিকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন, মলিন মুখে সহ্য করলেন স্কোর বোর্ডের চোখ রাঙানি, ৬ বলে ১২ রান!

ম্যাচের শেষ ওভার যেভাবে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা ছড়ালো তা যেন বিখ্যাত নাট্যকারের চরম উৎকণ্ঠায় ভরপুর রহস্যময় নাটকের শেষ দৃশ্য। কঠিন মুহূর্তে হাত খুলে খেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা মুস্তাফিজ প্রথম বলটি ব্যাটে বলের সংযোগ ছাড়াই উইকেট রক্ষকের হাতে, বাউন্সার। পরের বলেও বাউন্সার, কিপারের হাতে বল রেখে রান নিতে গিয়ে আউট মুস্তাফিজ।

টুয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যাকরণ মতে ওভারে দ্বিতীয় বাউন্সারটি নো বল হিসেবে বিবেচিত হবে, ব্যাটসম্যান পাবে হাত খুলে খেলার জন্য অতিরিক্ত ফ্রি হিট বল। কিন্তু শ্রীলংকান আম্পায়ারের অবিচল ভঙ্গির কারণে মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে উভয় দলের মধ্যে। একপর্যায়ে ম্যাচ বয়কট করে মাঠ ছেড়ে আসার জন্য ইশারা করতে থাকেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের মধ্যস্থতায় খেলা মাঠে গড়াই।

কুল ম্যান মাহমুদউল্লাহ জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নেন ব্যাট। প্রান্ত বদল করে দুই বলে চার ও দুই রানের পর জয়ের জন্য সমীকরণ ২ বলে ৬ রান। লেগ ষ্ট্যাম্পে করা পরের বলটি মিড উইকেটের উপর দিয়ে গ্যালারীতে আঁছড়ে ফেলা জয়সূচক যে ছয়ের মারটি মেরেছেন, তা চোখে মায়াঞ্জন বুলিয়ে বিমোহিত করে যাবে এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের বহুদিন।

১৮ বলে অপরাজিত ৪৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসের জন্য ম্যাচের নায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

You May Also Like