ঈদ মোবারক || ছোট গল্প

টিপু সুলতান
_______________

উতপ্ত গরম। আলোর সারোয়া জ্বলা সন্ধ্যা।
সন্ধ্যায় এক ল্যাঙড়া বন্ধু আরেক অন্ধ বন্ধুকে ফোন দিয়ে বলল,
– দোস্তো আজ কত কামাই করলে?

কলফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
দোস্তো আজ মোটামুটি কামাই হয়েছে। ততোটা বেশি ভালো না।
– কিন্তু তোমার কি অবস্থা ? ভালো। ভালো বলতে যেমন, কত?
এই ধরো সারাদিন ধরে হাজার পাঁচেক হবে আরকি।
– ও আচ্ছা।

দু’জনের আলাপচারীর শেষে এক জায়গায় মিলিত হলো। দু’জনে হাসাহাসি আর গলাগলিতে একাকার। ল্যাঙড়া বন্ধুর হাসি আর থামেই না। হাসতে হাসতে চোখের দুই কার্নিশে ফোঁটাফোঁটা অশ্রুজল বয়ে গেল। অন্ধ বন্ধু জিগ্যেস করলো,

– তুমি এতো হাসছ কেন?

ল্যাঙড়া বন্ধু হাসে আর ঠোঁট চেপে চেপে আধোবুলিতে কথা বলে।
জানো বন্ধু, আজ আমি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটা করেছি।
এ কথা শেষ হতে আবার হাসে।
অন্ধ বন্ধু কৌতূহলে দুনোমুনোয় পড়ে গেল। আর মনা বলতে কি এমন কাজ হায়!
– কি কাজ করেছ বন্ধু?

ল্যাঙড়া বন্ধু নির্লিপ্ত হাসি থামিয়ে বলল,
অনেক দিন পরে দেখি অকিলের বউ আর ছোট্ট বাচ্চা কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছে। আমি অনেক্ষণ লক্ষ্য করে ঠাওর করলাম।
তারপর চিনতে পেরে কাছে ছুটে যাই। কইলাম,
ভাবি তুমি এখানে।
অকিলের বউ দুঃখ করে কইল,

– ভাই তোমার ভাই মরে যাবার পরে আমরা আর ঠিকভাবে নাওয়া খাওয়া চালাতে পারিনে। একটা ফ্লাটে ঘরমোছার কাজ নিলাম, সে ব্যাটারা খুব খারাপ।ওরা খারাপ নজরে তাকায় আর কি সব যেন কয়। কি করব আর, তাই এই হাতপাতা কাজ বেছে নিলাম।
আমি নিজে না হয় উপোস থাকতি পারি তাইবলে কি কোলের ছোট্ট দুধের বাচ্চারে না খাইয়ে রাখা যায়।
তোমার ভাই যেভাবে চাইলো সেভাবে আর থাকতে পারলাম না ভাই।

ল্যাঙড়া ফকির চুপচাপ শুনে গেল। তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
ভাবি, অকিল ভাই বড্ড ভালো মানুষ ছিল। ভালো মানুষেরা দুনিয়ায় বেশিদিন থাকে না রে ভাবি, বেশিদিন থাকে না।

এই কথা বলতে বলতে ছুটে গেল বাচ্চাটির দিকে। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বলল,
আইসো বাবু, তোমাকে একটা সুন্দর জামা কিনে দিই।

ল্যাঙড়া ফকির ও অকিলের বউ, বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে কৃষি মার্কেটে ঢুকে গেল। বাচ্চাটির একটা লাল জামা ও অকিলের বউয়ের একটি শাড়ি কিনে দিয়ে বলল,

ভাবি, এই পাঁচশ টাকা দিলাম রাহো, বাবুকে সেমাই কিনে খাওয়াইও, সামনে ঈদ।

অকিলের বউয়ের চোখ টলমল করে মুখের রঙ বিবর্ণ আকার ধারণ করল। তারপর শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো কতক্ষণ।
ল্যাঙড়া ফকির চোখের দিকে তাকায়ে বলল,
ভাবি, এসব স্বয়ং খোদাতায়ালার ইচ্ছাময়ীতে হয়। দুঃখ কর না।

ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বলল,
বাবুরে তোমার মত আমার একটা বাবু ছিল। আজ আর সে বেঁচে নেই। এই পথে খেলা করতে করতে এক দজ্জাল প্রাইভেট কার এসে চাপা দিয়ে চলে গেল। নিথর দেহ ধরে চাইয়া রইলাম। আর ডাক শুনলো না। বাছা আমার!
তোমার ছেলেটারে দেখে আমার বাবুটার কথা মনে পড়ল।

হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে চুমু খেতে লাগল বাচ্চাটির কপালে। কাঁধে চাপিয়ে নাচাতে লাগল।
আর বলল,
তুমি বড় হয়ে তোমার মাকে সুখি কর বাপ।
কষ্ট দেবা না কখনো বাবা। মানুষ হও। পৃথিবী রয়েছে যুগযুগ কিন্তু ভালো মানুষের অভাব খুব।
ঈদ মোবারক বাবা, ঈদ মোবারক ভাবি।

এই বলে ল্যাঙড়া ফকির চোখ মুছতে মুছতে বাজারের ভেতর চলে গেল।
কানা বন্ধু অনুতপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল,

– হায়রে জীবন।
__________________

You May Also Like