ঐতিহ্যের সাক্ষী শতবর্ষী যশোর জেলা পরিষদ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা

আব্দুর রহিম রানা, যশোর ||

অবিভক্ত বাংলার প্রথম জেলা শহর যশোরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী যশোর জেলা পরিষদ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে সচিব/প্রকৌশলীর বাসভবনও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ যাত্রায় বেঁচে গেল জেলা পরিষদ মিলনায়তন। মঙ্গলবার যশোর জেলা পরিষদ কনডেমনেশন কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জেলা পরিষদ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আওয়াল।
২০১৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত যশোর জেলা পরিষদের সভায় জেলা পরিষদের ভবনসহ অফিস চত্বরে অবস্থিত জেলা পরিষদ মিলনায়তন (বিডি হল), পুরাতন প্রেসকক্ষ, সদর ডাকবাংলো, পরিদর্শন বাংলো, সচিব,  প্রকৌশলীর বাসভবন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বাস ভবনসহ চত্বরে অবস্থিত সকল ভবন ভেঙে বহুতলবিশিষ্ট অফিস ভবনসহ অডিটোরিয়াম ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই লক্ষ্যে চত্বরের সকল ভবন কনডেমড ঘোষণা করার লক্ষ্যে জেলা পরিষদ কনডেমনেশন কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক বরাবর ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর বর্ণিত ভবনসমূহ কনডেমড ঘোষণার নিমিত্তে মূল্য নির্ধারণপূর্বক জেলা পরিষদের সভায় অনুমোদন গ্রহণ করে কার্যবিবরণীসহ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়। সে মতে ভবনসমূহ ভেঙে ফেলা হলে ভবন থেকে প্রাপ্ত মালামালের বিবরণসহ প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়। প্রাক্কলনটি জেলা পরিষদের ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখের সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় সদস্যগণ বর্ণিত ভবনসমূহের পুরাতন মালামালের পরিমাপ ও মূল্য পুনঃনির্ধারণ সংক্রান্ত বর্ণিত প্রাক্কলনটি অনুমোদন করতঃ ভবনসমূহ কনডেমড ঘোষণার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে গতকাল যশোর জেলা পরিষদ কনডেমনেশন কমিটি এ ঘোষণা দেয়।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল জানান, জেলা পরিষদের আয়বর্ধনে শহরের প্রাণকেন্দ্র জেলা পরিষদের এ জায়গায় পরিষদের সকল ভবন ভেঙে বহুতল বিশিষ্ট অফিস ভবনসহ অডিটোরিয়াম ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। যেখানে অত্যাধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং ব্যবস্থা, মার্কেট, সিনেপ্লেক্স, অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম, কমিউনিটি সেন্টার, আধুনিক ও মানসম্মত আবাসিক হোটেল সর্বোপরি আধুনিক অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে।

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আওয়াল জানান, শুধুমাত্র জেলা পরিষদের মূল অফিস ভবন ও সচিব /প্রকৌশলীর বাসভবনকে কনডেমড ঘোষণা করার সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। একইসাথে বহুতল ভবনের নির্মাণের স্বার্থে অন্যান্য ভবনসমূহ অপসারণের সুপারিশ পাঠানো হবে।

সভায় জেলা প্রশাসনের সকল পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপস্থিত ছিলেন।

যশোরে যে কটি পুরানো ভবন ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে মাথা উঁচু করে আছে তার মধ্যে জেলা পরিষদ ভবন অন্যতম। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ প্রতিষ্ঠান আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করে আসছে। এক সময় জেলার সকল উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যশোর তথা যশোরবাসীর গর্ব এ ভবন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। ২০১৩ সালে ৩ মার্চ জেলা পরিষদ ভবন একশ’ বছর পূর্ণ করেছে। এ ভবন প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর আগে ১৮৮৬ সালে এখান থেকে এ অঞ্চলে সেবা প্রদান করা শুরু করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

জেলা পরিষদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২শ’ ৩৩ বছর আগে ১৭৮১ সালে যশোর জেলা ঘোষণার পর জেলার উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের জন্য ১৮৮৫ সালের লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় জেলা বোর্ড সৃষ্টি হয়। এরপর ১৯৫৯ সালে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের স্থলে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল গঠন করা হয়। ১৯৭৬ সালের ‘স্থানীয় সরকার আইনে’ এটা জেলা পরিষদ নামে অভিহিত হয়। ১৮৮৫ সালের লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় জেলা বোর্ড সৃষ্টির পর পরই ১৮৮৬ সালে যশোর জেলা বোর্ড সৃষ্টি এবং ৩ মার্চ ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে জেলা বোর্ড ভবন নির্মিত হয়। যা অবিষ্কৃত অবস্থায় একশ’ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে আছে।

এ ভবনের উদ্বোধন করেন তৎকালিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট J. H. LINDSAY ESQ এমএ আইসিএস। উদ্বোধনের ৫২ বছর পর ১৯৬৫ সালে জেলা পরিষদ গণমিলনায়তন মৌলিক গণতন্ত্রী ভবন যা বিডি হল নামে পরিচিত, নির্মিত হয়। ২৫ শ্রাবণ ১৩৭৪ বিডি হল ভবনের উদ্বোধন করেন ডেপুটি কমিশনার কামাল উদ্দিন চৌধুরী সিএসপি।

যশোর জেলা পরিষদ একটি কমিটির দ্বারা পরিচালিত হয়। এই কমিটির প্রধান হচ্ছেন চেয়ারম্যান। ১৯২০ সাল থেকে নির্বাচিত বা মনোনীত ১০ জন চেয়ারম্যান যশোর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দায়িত্ব পালন করেছেন রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার। এরপর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন প্লিডার বিজয় কৃষ্ণ মিত্র, অ্যাড. সৈয়দ নওশের আলী, অ্যাড. ওয়ালিউর রহমান, অ্যাড. খান বাহাদুর লুৎফর রহমান (দুবার), অ্যাড. মশিউর রহমান, অ্যাড. সৈয়দ আবদুর রউফ, অ্যাড. সৈয়দ শামসুর রহমান, অ্যাড. রওশন আলী ও অ্যাড. আবদুল কাদের।

জেলা বোর্ড স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা হলেও কার্যত ছিল সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। মহকুমা স্তরের লোকাল বোর্ড, জেলা বোর্ডের সদস্য মনোনয়ন দিত। ভাইস-চেয়ারম্যান বোর্ডের সদস্যের মধ্যে থেকে সদস্য দ্বারা নির্বাচিত হতেন। জেলা বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ০৯ জনের কম ছিল না। ১৯২০ সালের পর প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় এবং কার্যকাল নিরূপিত হয় ৩ বছর। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত জেলা বোর্ড ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের একটি দপ্তর। পরবর্তীকালে ৩ স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান দ্বিস্তরে পৌঁছে। ১৯৮২ সালে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে বর্তমানে ৩ স্তরে চালু আছে।

You May Also Like