মাইকেলের সাগরদাঁড়িতে মধুমেলা শুরু ২২ জানুয়ারী

আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ ॥

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৫ তম জন্মদিবস পালন উপলক্ষে তার জন্মস্থান কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মধুমেলা। বিশ্বের যা কিছু সৃষ্টি তার সবকিছুর মূলে রয়েছে কোনো না কোনো ব্যক্তি বা যুগের বিশেষ অবদান। যদি সে সৃষ্টি মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হয়, তাহলে আজীবন সৃষ্টির উদ্যোক্তা ও সেই যুগ কালের শুভ্র পাতায় অবিনশ্বর হয়ে থাকবে।

যশোরের কেশবপুর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সাগরদাঁড়ি গ্রাম এক অবহেলিত, অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ এলাকার নাম। এখানে ছিলো না কোনো উন্নত রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই গ্রামেই ১৮২৪ সালে জন্মে ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সাগরদাঁড়ি গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। পিতা জমিদার রাজ নারায়ণ দত্ত, মাতা জাহ্নবী দেবী। এই জমিদার বাড়িতে কাটে কবি মধুসূদনের শৈশব। বাড়ির চার পাশে রয়েছে অসংখ্য আম, কাঁঠালসহ নানাবিধ বনোজ বৃক্ষ। সূর্যের আলো এখানে নামতে না পারলেও হরেক রকমের পাখির কলতানে থাকে মুগ্ধ। প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি, এখানে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতির চিহ্ন গুলো। জমিদার বাড়ির সামনে রয়েছে কবি মধুসূদন দত্তের দু’টি আবক্ষ মূর্তি। কবির বাসগৃহটি ১৯৯৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহণ করেন। পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে কবির জন্মস্থান সাগরদাঁড়িকে মধুপল্লী ঘোষণা করেন।

সেই থেকে প্রতিবছর ২৫ জানুয়ারি পালন করা হয় সপ্তাহব্যাপি মধুমেলা। সেসময় রাজবাড়িটি পুনঃসংষ্কার করা হয়। এই বাড়ির ভেতর খোলা হয়েছে যাদুঘর সেখানে মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহৃত খাট, পালঙ্ক, আলনা গচ্ছিত করে রাখা হয়েছে। বাড়িটির চারপাশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়ির পশ্চিম পাশে বিশাল আকৃতির পুকুর। পুকুরের যে ঘাটে বসে কবি মধুসূদন স্নান করতেন সেই পাকাঘাটটি আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। পুকুরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে কবির স্মৃতি বিজড়িত কাট বাদাম গাছ। কবি ছোট বেলায় এই গাছের গোড়ায় বসে কবিতা লিখতেন। আজ পরিচর্যার অভাবে গাছটি মৃত প্রায়। গাছের গোড়ার ইটের গাঁথুনি খুলে বণ বিভাগ অথবা কৃষি অধিদপ্তরের আওতায় এনে গাছের পরিচর্যা করা হলে মধুস্মৃতি জড়িত গাছটাকে আরো কয়েক বছর বাঁচিয়ে রাখা যেত।

১৮৩০ সালে মধুসূদন সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কোলকাতা খিদিরপুর যান বাবার সাথে। তারপর দীর্ঘপথ চলা। কিন্তু ভোলেননি তার জন্মস্থানের কথা, কপোতাক্ষ নদের কথা। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ১৮৬২ সালে কবি স্ত্রী-পুত্র কন্যাকে নিয়ে নদী পথে বেড়াতে আসেন সাগরদাঁড়িতে। কিন্তু মায়ের দেখা পাননি। দাম্ভিক পিতার ধর্ম ও কুসংস্কার নাস্তিক পুত্রকে মায়ের সাথে দেখা করতে দেয়নি। তখন তিনি চলে যান মামার বাড়ি পাইকগাছার কাঠি পাড়া গ্রামে। মামা বংশধর ঘোষের বাড়ি তিনি সমাদর পান। সেখান থেকে তিনি মায়ের সাথে দেখা করার জন্যে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে তাবুতে কয়েকদিন অপেক্ষা করে আবার কলকাতায় চলে যান। এর পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। কবির এই স্মৃতি বিজড়িত বিদায় ঘাট সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সাগরদাঁড়ি থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার উত্তরদিকে শেখপুরা গ্রামে অবস্থিত ত্রিগম্বুজ জামে মসজিদ। মসজিদটি আঠারো দশকে মোঘল আমলে নির্মিত। এই মসজিদের তৎকালিন ঈমাম ফার্সি পন্ডিত খন্দকার মখমল আহম্মেদের কাছে মধুসূদন শৈশবে বাংলা ও ফার্সি শিক্ষা লাভ করেন। কবির স্মৃতি বিজড়িত এই মসজিদটি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে পরবর্তিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় সংস্কার করা হয়। মসজিদটি দেখলেই কবির শৈশব স্মৃতি মনে পড়ে যায়।

কবিকে স্মরণ করতে সাগরদাঁড়িতে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে প্রায় দু’কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রতি বছর ২৫ জানুয়ারি থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ৭ দিন ব্যাপি বসে মধুমেলা। কিন্তু এবার সামনে এসএসসি পরীক্ষা থাকায় মেলা ২২ জানুয়ারী থেকে শুরু হচ্ছে। যা চলবে ২৮ জানুয়ারী পর্যন্ত। মেলার আশপাশের শতাধিক গ্রাম থেকে আসে মধুভক্তরা। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি সাহিত্যিকদের মিলনমেলা চলে। তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মধুপল্লী নির্মাণের ঘোষণা দেয়ায় ২০০১ সালের মধ্যে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয় মধুপল্লীর নির্মাণ কাজ। ঘোষণা অনুযায়ী সাগরদাঁড়িতে মধুসূদন মিউজিয়াম, পিকনিক কর্ণার, অতিথি শালা, কুঠিরের আদলে গেট, একটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে মধুমঞ্চ ও দু’টি অভ্যর্থনা কেন্দ্র নির্মাণ করে মধুপল্লীকে আকর্ষণীয় করা হয়েছে। যার কারণে প্রতি বছর জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান ধেকে মধুভক্তরা আসে সাগরদাঁড়িতে শিক্ষা সফর ও বনভোজনে। এই স্থানে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে সর্ববৃহৎ মেলায় থাকে বাঙালি সংস্কৃতির চিরচেনা রূপ। সার্কাস, যাদু, পুতুলনাচ, মৃত্যু কূপে মটরসাইকেল চালনা, নাগরদোলা, বিভিন্ন স্টলে হস্ত ও কুটির শিল্পের পসরা, এলাকার পুরস্কার প্রাপ্ত কৃষকদের পণ্যে সমৃদ্ধ কৃষি মেলা, মধুকবির জীবণ নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, এলাকার শিল্পী ছাড়াও দেশ বরেণ্য শিল্পীদের আগমন ঘটে মেলায়। লাখ মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় কপোতাক্ষ পাড়ের এই নিভৃত পল্লী সাগরদাঁড়ি।

কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শাহিন জানান, মেলার মাঠে কোন রকম বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানূর রহমান বলেন, মধুমেলায় কোন প্রকার অশ্লীলতা সহ্য করা হবে না। প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত মধুমেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। প্রতিবারের ন্যায় এখানে একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ডিবি, জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সাথে প্রয়োজন মতো সাদা পোশাকে পুলিশ ও র‌্যাব-৬ এর টহল বলবৎ থাকবে। এছাড়া মাঠে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগ করা হবে। স্থানীয়ভাবে শতাধিক যুবকদের নিয়ে তৈরি করা হবে সেচ্ছাসেবক বাহিনী।

You May Also Like