কেশবপুরে জলাবদ্ধতায় ১৪ গ্রামের ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ অনিশ্চিত

জি. এম. এম কেশবপুর(যশোর) ||

কেশবপুরে জলাবদ্ধতায় এবার প্রায় ১৪ গ্রামের ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কৃষি জমিতে অপরিকল্পিত ভাবে মাছের ঘের ব্যবসায়ীরা নদীর লোনা পানি তুলে দেয়ায় কেশবপুর উপজেলার পূর্ব অংশের বিভিন্ন বিলে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে এবার বোরো ধানের চাষ করা অনিশ্চত হয়ে পড়েছে। বোরো নির্ভর কেশবপুরের চাষীদের কারণে কারনে মাথায় হাত উঠেছে। ঘের মালিকরা সময় মতো পানি সেচে বোরো আবাদের সুযোগ করে দেবার কথা থাকলেও তারা পানি সেচে দেয়নি। ফলে দিশাহারা হয়ে চাষিরা বিলের জমির পানি সংঘবদ্ধ হয়ে স্যালোম্যাশিন দিয়ে সেচের মাধ্যমে ধান রোপনের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

সরেজমিন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বৃষ্টির শুরুতে উপজেলার পূর্বাংশের কয়েকজন প্রভাবশালী ঘের ব্যবসায়ী মাছ চাষের জন্য স্লুইস গেটের মুখের বাঁধ কেটে বিলে লোনা পানি তুলে দেয়। যখন পানি উঠানো হয় তখন পানির সাথে ব্যাপক হারে পলিমাটি এসে বিলের তলায় জমা হয়। নদীর সংযোগ খাল পলি জমে উচু হয়ে যাওয়ায় ঘের ব্যবসায়ীগণ চেষ্টা করেও বিলের পানি বের করে দিতে পারিনি। কৃষকের চুক্তি মতো জমি থেকে পানি অপসারণ করতে না পারায় বোরো আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে কেশবপুর উপজেলার চুয়াডাঙ্গা, কৃষ্ণনগর, বুড়ুলি, ব্রাহ্মনডাঙ্গা, হৃদ, মাগুরখালি, সাগদত্তকাটি আটন্ডা, শ্রীফলা, পরচক্রা, কালিয়ারই, বাউশলা, ভবানিপুর, হিজলডাঙ্গা গ্রাম উল্লেখযোগ্য।

মাগুরখালী গ্রামের সাবেক মেম্বর বাবলু রহমান জানান, বিল গরালিয়ায় তাদের ২৫/৩০ বিঘা জমিতে পানি জমে থাকায় এবার তারা বোরো আবাদ করতে পারবেন না। খাল বুক উচুঁ হয়ে যাওয়ায় ঘেরের পানি খাল দিয়ে রেরুতে পারছে না। সাগদত্তকাটি গ্রামে রজব আলীর একই কথা জানান। চুয়াডাঙ্গা গ্রামের মিঠু সরকার বলেন, বিলে আমার ৬ বিঘা ৫ কাঠা জমি সম্পূর্ণ ঘেরের পানির নিচে। ঘের মালিক চুক্তি মোতাবেক জমি থেকে পানি সেচে দিতে পারল না। পংকজ মল্লিক জানান, তার মাত্র ৪ কাঠা ধানি জমি পানি সেচে না দিলে ধান রোপন করতে পারবো না।  একই অবস্থা হিমাংস গুলদারের সম্বল বলতে ১ বিঘা ধানি জমির।

এদিকে খাল দিয়ে পানি রেরুচ্ছে না বলে ঘের মালিকরা হাত পা গুটিয়ে নেয়ায় বাধ্য হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জমির মালিকরা বিঘা প্রতি ১ হাজার টাকা দিয়ে নিজ দায়িত্বে জমির পানি সেচে আবাদের চেষ্টা করছেন। বুড়ুলি গেটের মুখে বাঁধ দিয়ে ৪০টি স্যালোমেশিন দিয়ে পানি সেচে জমিতে বোরো চাষের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেচের কাজ সম্পন্ন করতে সুফলাকাঠি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুনজুর হোসেনকে আহবায়ক ও হৃদের সিরাজুল ইসলাম, বুড়ুলির আব্দুল কাদের ও হরেন বাবুকে নিয়ে তারা ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছেন। সেচ কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত মাসের ১০ তারিখে শুরু করা হয়েছে। আরো ১০ দিন লাগবে শেষ করতে। এখনো পর্যন্ত সরকারীভাবে কোন সাহায্য সহযোগিতা তারা পায়নি বলে জানান।

অন্যদিকে উপজেলার বিদ্যানন্দকাঠি ইউনিয়নের ১২ গ্রামের পানি নিষ্কাসনের একমাত্র পথ ডুমুরিয়া উপজেলার নূরানিয়ার কাটাখাল। ওই উপজেলার নূরানিয়া গ্রামের মধ্যে একটি ব্রিজ নির্মাণের স্বার্থে ঠিকাদার খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশন হয়নি। ফলে ১০ গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার বিঘা জমিতে চলতি বোরো মৌসুমে ধান চাষ সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে এলাকার শত শত কৃষক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের স্মারকলিপি দিয়েও কোন প্রতিকার পায়নি বলে এলাকাবাসি জানিয়েছে।

বিদ্যানন্দকাঠি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজেদ হোসেন জানান, তার এলাকার এক হাজার বিঘা জমিতে পানি জমে রয়েছে। কোনভাবে এই পানি বের করা যাবে না। ফলে বোরো আবাদও হবে না।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানুর রহমান জানান, জলাবদ্ধতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পানি নিষ্কাশনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এখনই বলা যাবে না কত হাজার হেক্টর জমি বোরো ধান চাষ করা সম্ভব হবেনা। কারন ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বোরো ধান রোপন করা যায়। আমাদের পক্ষ থেকে মাসিক সমন্বয় কমিটির মিটিং এ একাধিকবার বিষয়টি উঠানো হয়েছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কেশবপুর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সাইদুর রহমান জানান, গত বছর বর্ষার শুরুতে জরুরী ভিত্তিতে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় বুড়ুলির খাল খনন করা হয়েছিল। গত বছর কম বৃষ্টিপাতের কারনে জোয়ারে ব্যাপক পলি আসায় আবারো ভরাট হয়ে গেছে। চলতি বছর কেশবপুরে যে সকল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সে সকল কাজের টেন্ডার হয়ে গেছে। ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছে। দ্রুত খনন কাজ শুরু হবে। তখন আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। আমাদের কাছে থোক বরাদ্ধ না থাকায় কৃষকের সাথে কোন কাজ করা সম্ভব না এবং একই বছর দুইবার বিশেষ প্রকল্পে অফিসিয়াল বিভিন্ন সমস্যা থাকে।

You May Also Like