খেজুর রসের গন্ধ ও গুড়ে মাতোয়ারা কেশবপুরবাসি

জি. এম. মিন্টু, কেশবপুর(যশোর) ||
যশোরের যশ খেজুরের রস। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও যশোর জেলার গাছিরা শীতের মাঝা মাঝিতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য যশোর জেলার কেশবপুর খেজুর গাছের। কেশবপুরে এক সময় খেজুরগুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। শীত শুরু হবার প্রথম এবং মাঝ পথে খেজুর রস থেকে গুড় তৈরির প্রতিযোগিতা পড়েছে গ্রামঞ্চলে। সেই সাথে রস খাওয়ায়ও। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক এ অঞ্চলের খেজুর গাছ। অনেকে এটা শখের বসে বলে থাকেন মধুবৃক্ষ। গত কয়েক বছর ইট ভাটার জ্বালানি হওয়ায় দ্রুত খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। যশোরে খেজুর গাছের সংখ্যা কমিয়ে যাওয়ায় বন বিভাগের উদ্যোগে ২০০৯ সালে বেশ কিছু খেজুর গাছ রোপন করা হয়। বর্তমানে খেজুর রস ও গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে যশোর শহরে ৫ বন্ধু মিলে “কেনারহাট” নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁরা অনলাইনের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে ভেজালমুক্ত খেজুরের গুড় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা ৩ জন গাছির ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সেই সাথে ৩৪ জন গাছিদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছ, বৃহত্তর যশোর জেলার জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্প আওতায় গত কয়েক বছরে রোপিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ খেজুর গাছের চারা। দেশী জাতের সাথে পরীক্ষামূলকভাবে আরব দেশীয় খেঁজুরের চারাও রোপিত হয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এলাকার মানুষ সুফল পাবে। অতীতে কখনও খেঁজুরের চারা রোপন করা হয়নি। যশোরের আবহাওয়ার সাথে মানানসই খেঁজুর গাছ এমনিতেই জন্মে। বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় খেজুরের বাগান। এখন শীতকাল তাই অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছের কদর বেড়ে উঠেছে। কারণ এ গাছ এখন দিচ্ছে গাঢ় মিষ্টি রস। রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা, দানা গুড় ও পাটালি তৈরী করা হয়। খেজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামী চিনিও তৈরী করা হতো। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাদের তৃপ্তিতে বাদামী চিনির জুড়ি নেই। এখন অবশ্যই সেই চিনির কথা নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মত মনে হয়।

খেজুর গাছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যত বেশী শীত পড়বে তত বেশী মিষ্টি রস দেবে। পুরোপুরি মৌসুমে চলছে রস, গুড়, পিঠা, পুলি, পায়েস খাওয়ার পালা। সেই সাথে নতুন গুড়ের মিষ্টি গন্ধে ধীরে ধীরে আমোদিত হয়ে উঠবে গ্রাম বাংলা। দিন শেষে গ্রামীণ সন্ধ্যাকালিন পরিবেশটা বড়ই আনন্দের। খেঁজুর রসের কারণে গ্রামীণ পরিবেশটা মধুর হয়ে উঠে। মন ভরে যায় সন্ধ্যার খেঁজুরের রসে।

এখন পুরাদমে চলছে রস সংগ্রহ করার পালা। চলছে খেজুর গাছের রস খাওয়ার ধুম। শহর থেকে অনেকে দলে দলে ছুটে আসে গ্রামে। এই সময় খেজুর গাছ থেকে রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণচাঞ্চল্য বাড়ে। যদিও আগের মত সেই রমরমা অবস্থা আর নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে কম বেশী খেঁজুর গাছ এখনও রয়েছে। তবে যশোর জেলার ঐতিহ্য থাকার কারণে বলা হয়ে থাকে যশোরের যশ খেঁজুরের রস। যশোর অঞ্চলে এক সময় গড়ে উঠেছিল খেঁজুর গুড়ের চিনি  উৎপাদনের কারখানা। যা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কেশবপুর উপজেলা খেঁজুরের গুড়ের জন্য বিখ্যাত থাকায় দেশ বিদেশ থেকে পাইকারী ক্রেতা ভাল খেঁজুরের গুড় কেনার জন্য এখানে আসতো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনসহ কালের বিবর্তনে এখন খেঁজুরের গুড়ের কথা অনেকের মনে নেই। এখন শিল্পও আর নেই, নেই চিনি উৎপাদনের কারখানাও। কোন রকম চলছে খেঁজুর গাছ থেকে রস আরোহন করে গুড়, পাটালী তৈরী ও পিঠা পায়েস খাওয়ার কাজ। তাও চাহিদার তুলনায় একবারে কম। অথচ পরিকল্পিত ভাবে খেঁজুরগাছ লাগানো হলে শুধু মৌসুমের উপদায়ী রস গুড় নয়, দেশীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারকে এ ব্যাপারে বহুবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর বন বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছে খেঁজুর গাছ লাগানোর এবং গবেষণা করা হচ্ছে কিভাবে অর্থকারী করে তোলা যায়। এদিকে এই শিল্পর সরকারী পৃষ্টপোষকতা না থাকায় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।

প্রতি বছর ইটভাটা ও টালি তৈরিতের কারখানায় প্রচুর পরিমাণে খেজুর গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধানে  জানা গেছে, যশোর থেকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর যাবার রাস্তা ধরে ১০ কিলোমিটার এগুলে সামনে পড়বে হাকিমপুর বাজার। বাজারের পশ্চিম পাশে ২/৩কিলোমিটরি পশ্চিমে তাহেরপুর বাজার। এখানে এক সময় খেঁজুরের গুড় থেকে চিনি উৎপাদনের বিশাল কারখানা গড়ে উঠেছিলো। বর্তমানে কারখানাটি ধ্বংশস্তপ। মাটি দিয়ে ঢাকা রয়েছে। এখন এটা কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। ১৮৬১ সালে  ইংল্যান্ডের এক নাগরিক তাহেরপুরে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চিনি উৎপাদন করেছিলেন বলে জানা যায়। খেজুরের রস ও গুড় ওই কারখানার কাঁচা মাল হিসাবে ব্যবহার হত। প্রায় একটানা ২০ বছর চালু থাকার পর বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৮৪ সালে পুনরায় কারখানাটি চালু করেন এ্যমেট এন্ড চেম্বার কোম্পানি। ১৯১০ সাল পর্যন্ত চলে খেঁজুর গুড়ের চিনি উৎপাদন কারখানাটি। ওই সময়ে চিনির জন্য দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন বণিক দল ছুটে আসতো তাহেরপুরে। বড় বড় জাহাজও ভিড়তো খেজুরের চিনির সন্ধানে।

কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখী হনুমানদের প্রিয় খাদ্য হলো এই খেজুর। হনুমানেরা কাঁচা-পাঁকা খেজুর খেয়ে সাবাড় করে দেয়। খেজুরের পাতা দিয়ে পাটি তৈরী এবং জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার কর হয়। কোন পরিচর্যা ছাড়া খেঁজুরের গাছ বিভিন্ন স্থানে ঝোপ আকৃতিতে বড় হয়ে উঠে। জমির আইলে, বাগানের পতিত জমিতেও বাড়ির আঙ্গিনায় খেঁজুর গাছ বেশী জন্মে। ৫ বছর পর একটি গাছ রস দেবার উপযোগী হয়। ১৫/২০ বছর পর্যন্ত ভালোভাবে গাছ থেকে রস পাওয়া যায়। খেজুর গাছ বছরের ৪ মাস রস দেয়। ১০/১২টি খেঁজুরগাছের রস ও গুড় বিক্রি করে ১ টি পরিবার অনায়াসে সংসার ব্যয় চালাতে সক্ষম হয়।

You May Also Like