উপকেন্দ্র নির্মাণে ঠিকাদারের গড়িমসি || কেশবপুরে গ্রীষ্ম মওসুমের শুরুতেই বিদ্যুৎ বিপর্যয়

আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ ॥

কেশবপুরের ভালুকঘরে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণে ঠিকাদারের গড়িমসির কারণে গ্রীষ্ম মওসুমের শুরুতেই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে উপজেলার ৭২ হাজার গ্রাহক। গত বছর এ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় গ্রাহকের সংখ্যা তিনগুন বেড়ে গেছে। পাশাপাশি গ্রীষ্ম মওসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পুরাতন একমাত্র উপকেন্দ্রটির ওভার লোডের কারণে দুই বছর আগে আরও একটি উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু নির্মাণাধীন ভালুকঘর উপকেন্দ্রের কাজে ঠিকাদারের গাফিলতির ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লো-ভোল্টেজের কবলে পড়েছেন গ্রাহকরা। পাশাপাশি একমাত্র উপকেন্দ্র থেকে প্রতিটি আউটগোয়িং (সঞ্চালন) ফিডার প্রায় ৩শ’ কি.মি. দীর্ঘ হওয়ায় একটু জোরাল বাতাস বা সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎবিহিন থাকতে হয় গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের।

ভালুকঘর উপকেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে চালু না হওয়ায় আলতাপোল উপকেন্দ্রের সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের অক্ষমতায় এবং দীর্ঘ লম্বা ফিডারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় ২০০১ সালের ২৮ মার্চ কেশবপুর জোনাল অফিসের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় আলতাপোল এলাকায় ১০ এমভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এ উপজেলায় গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১২১ জন। ওই সময় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ৭ মেগাওয়াট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এরপর গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। ফলে বাধ্য হয়ে ২০১৬ সালে আলতাপোল উপকেন্দ্রটিতে ৫ এমভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার সংযোজন করে সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়ানো হয়। ওই সময় বিভাজন করে ফিড়ার সংখ্যা বাড়নো হলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা থেকেই গেছে। পাশাপাশি বেশ কিছুদিন ধরে লো-ভোল্টেজের সমস্যায় ভুগছেন গ্রাহকরা।

এ ব্যাপারে কেশবপুর জোনাল অফিসের ডেপুটী জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আবু আনাস মোঃ নাসের বলেন, নওয়াপাড়ার গ্রীড সাবষ্টেশান থেকে ৩৭ কি.মি. দূরাত্বে বিদ্যুঃ সঞ্চালন হয় আলতাপোলের স্থানীয় সাব ষ্টেশনে। আবার উপজেলার অভ্যন্তরীন ফিডারগুলো দুইশ’ থেকে তিনশ’ কি.মি. দীর্ঘ। ফলে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ পেলেও সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং অন্যান্য দুর্ঘটনার কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। সেটিও অবশ্য সাময়িক সময়ের জন্য। এ সমস্যা দূর করার জন্য ভালুকঘর সাবস্টেশনটি কমিশনিং করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি পাঁজিয়ায় যে সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে সেটাও দ্রুত চালু হলে প্রতিটি ফিডারের দীর্ঘতা কমে আসবে এবং ওই সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। 

জানা গেছে, একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে কেশবপুর উপজেলা গঠিত। গত বছর কেশবপুর উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গত বছরের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফান্সের মাধ্যমে কেশবপুরকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে উদ্বোধন করেন। বর্তমান এ উপজেলায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, দাতব্য, সেচ, সড়ক বাতি ও শিল্প শ্রেণীর ৭২ হাজার ২৭০ জন গ্রাহক রয়েছে। এসব গ্রাহকের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা শীতকালে ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট হলেও গ্রীষ্মকালে ১৫ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। যা আলতাপোল উপকেন্দ্র থেকে সঞ্চালন ও বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ সব ভেবেই নতুন একটি উপকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ভালুকঘর মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভালুকঘর ৩৩/১১ কেভি ১০ এমভিএ উপকেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু করেন মেসার্স সানরাইজ এন্টারপ্রাইজ। ২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর উপকেন্দ্রটির কমিশনিং করার জন্য উক্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এর জন্য ৩৩ কেভি সোর্স লাইন ও ১১ কেভি আউটগোয়িং ফিডার নির্মাণের কাজও করা হয়েছে। কিন্তু উপকেন্দ্রের স্থাপনা নির্মাণ ও মেশিনারিজের কাজ শেষ না হওয়ায় সানরাইজ এন্টারপ্রাইজ চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেয়। কিন্তু অদ্যাবধি উপকেন্দ্রটি কমিশনিং (চালু) করা সম্ভব হয়নি। সরেজমিনে জানা গেছে, উপকেন্দ্রটির গ্রাউন্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়নি এবং ইলেকট্রিক ইক্যুপমেন্ট স্থাপনের কাজও বাকি রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উপকেন্দ্রটির ৫৯ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মসংশ্লিষ্টরা জানান। অথচ আগামী ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। আসন্ন রমজান মাস ছাড়াও জুন মাসে গ্রাহকদের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকবে বলে জানা গেছে। ফলে এ সময়ের মধ্যে উপকেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব না হলে গ্রাহকরা আরও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।

এ ব্যাপারে মেসার্স সানরাইজ এন্টারপ্রাইজের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকৌশলী সৈয়দ সুজন মীর বলেন, গাফিলতি বা গড়িমশি বলা যাবে না। বিভিন্ন কারণে কাজ ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে সাবস্টেশনটি কমিশনিং করা সম্ভব হয়নি। অন্যান্য যন্ত্রাংশ পৌঁছালেও অতি গুরুত্বপূর্ণ কেবল (তার) এখনো পৌঁছায়নি। কেবল পৌঁছালে চলতি মাসেই কমিশনিং (চালু) করা সম্ভব হবে বলে আশা রাখছি।   

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, আরইই কেডিপি-২ প্রকল্পে পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ খুলনা বিভাগীয় কার্যক্রম-২ এর আওতায় কেশবপুর-২ (ভালুকঘর) সহ ৮টি উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছে মেসার্স সানরাইজ এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু কিছু ফরেন গুডস্ সংকটের কারণে ভালুকঘর উপকেন্দ্রটি কমিশনিং করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অতি দ্রুত উপকেন্দ্রটি কমিশনিং করার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কেডিপি-২ এর প্রকল্প পরিচালক হিন্দোল দাশ বলেন, উপকেন্দ্রটি চালু করার জন্য কেবল ছাড়া সব ইক্যুপমেন্ট ভালুকঘর পৌঁছে গেছে। আগামী জুন মাসে প্রজেক্ট ক্লোজ হবে। তার আগেই উপকেন্দ্রটি চালু করা হবে।

You May Also Like