বিলুপ্ত প্রায় গরিবের বাংলা ‘এসি’ মাটির ঘর

আব্দুর রহিম রানা ||

মাটির দেয়াল, ওপরে টিন বা খড়ের চাল, সামনে বড় উঠোন, এই হলো ‘গরিবের এসি’ ঘর। মাটির দেয়ালে গড়া সাতচালা বা আটচালা জোড়া বাংলা ঘর এখন আর দেখা যায় না। দেখা মেলে না গোলপাতায় বা খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরও। সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়ির সামনে সেই বৈঠকখানা বা দহলুজঘর তো বিলুপ্তই হয়ে গেছে। শান্তির নীড় সেসব মাটির ঘরের স্থান দখল করেছে ইট-পাথরের দালান। চিরচেনা গ্রামগুলোকেও তাই এখন অচেনা লাগে। তবে, এখনও চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় চোখে পড়ে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত আটচালা ঘরটি। হয়তো জাতীয় কবির স্মৃতি বহনকারী হিসেবেই এখনও টিকিয়ে রাখা হয়েছে ঘরটিকে। এছাড়াও প্রত্যন্ত  গ্রামাঞ্চলে ঢুঁকলে দু’একটি মাটির ঘর চোখে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার পাশাপাশি তীব্র গরম ও কনকনে শীতে আদর্শ বসবাস-উপযোগী এসব ঘর তৈরি হতো মাটিতে।

এ প্রসঙ্গে প্রবীণেরা জানান, এঁটেল মাটি কাদায় পরিণত করে দুই-তিন ফুট চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হত। ১০-১৫ ফুট উঁচু দেয়ালের ওপর কাঠ বা বাঁশের চাল তৈরি করে খড়-কুটা, গোলপাতা, টালি অথবা ঢেউটিন দিয়ে ছাওয়া হতো। মাটি কুপিয়ে ও পানি দিয়ে কাদায় পরিণত করার পদ্ধতিকে জাব বলা হয়। জাব কেটে তা সুচারুভাবে গেঁথে ভাজে ভাজে তৈরি করতে হয় দেয়াল। যিনি মাটির চাপ গেঁথে দেয়াল  ও বাঁশ দিয়ে চাল তৈরি করেন তাকে ঘরামি বলা হয়।  

ঘরের বারান্দা ও চালের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ঘরকে বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। চারপাশে বারান্দা থাকা ঘরকে আটচালা এবং তিনপাশে বারান্দা থাকা ঘরকে সাতচালা ঘর বলা হয়। গৃহিণীরা মাটির দেয়ালে বিভিন্ন রকমের আল্পনা একে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতেন। শৈল্পিক আল্পনায় ফুটে উঠতো নিপুণ কারুকার্য।

বৈঠকখানা বা দহলুজঘরে এক সময় বসতো গ্রামের মানুষের আড্ডা, বিনোদন আর গল্পের আসর। সাধারণ মানুষ তাদের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, মান-অভিমান, আনন্দ-বেদনা প্রকাশ করতেন মোড়ল বা মাতবরের এ দহলুজঘরে বসে। হুক্কায় টান দিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিতেন।

ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে একটি মাটির ঘর শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হয়। অথচ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষা মৌসুমে মাটির ঘরের ক্ষতি হয় বলে ইট-সিমেন্টের ঘর নির্মাণে উৎসাহী হচ্ছে মানুষ। আধুনিকতার ছোঁয়া আর কালের আবর্তে তাই দালান-কোঠা আর অট্টালিকার কাছে হার মানছে মাটির ঘর।

যশোর সহ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামেই অনেক পরিবার মাটির ঘরে বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। আশির দশকেও এসব গ্রামে কাঁচা ঘরবাড়ি দেখা যেত। গরিবের এসির সংখ্যাধিক্যে ইট-পাথরের তৈরি পাকা দালানের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। সেই দিন বদলে গেছে। কাঁচাঘর ফেলে পাঁকাঘর নির্মাণে ঝুঁকছেন এ জেলার মানুষ। ফলে, হাতেগোনা দু’একটি মাটির ঘর দেখা যায়। অধিকাংশ বাড়ি এখন ইট পাথরের তৈরি।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের খাকুন্দি গ্রামের মাটিরঘর তৈরির কারিগর মওলাবকস জানান, বাপ-দাদাও এই পেশায় জড়িত ছিলেন। বাবা মৃত আদম আলী  ছিলেন তার দাদার সহযোগী। কয়েক বছর সহযোগী হিসেবে থাকার পর তার বাবাও এক সময় হয়ে যান মাটির ঘরের পাক্কা কারিগর। এক সময় মাটির ঘরের প্রচুর চাহিদা ছিল। বছরে ১০-১২ ঘরের কাজ পেতেন তিনি। তখন তাদের সংসার চলতো ভালোভাবেই। বাবার সঙ্গে কাজ  করায় তিনি কারিগর হয়ে যান। কিন্তু, এখন আর আগের মতো মাটির ঘরের চাহিদা না থাকায় তিনিও দূরে সরে গেছেন এই পেশা থেকে।

কত বছর হচ্ছে আপনি এই পেশা ছেড়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ১০/১২ বছর ধরে এই কাজ করি না। এই কাজ চালু রাখলে তো পেটে ভাত মিলবে না। তাই এই পেশা ছেড়ে এখন মাঠে চাষাবাদের কাজ করি।

আপনি কি এখনো মাটির ঘরে বসবাস করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মাটির ঘর আছে। তবে ওটাতে থাকা হয় না। নতুন টিনের ঘর করেছি, ওটাতে থাকা হয় এখন। তবে মাটির ঘরে থাকার আরাম আর কোনো ঘরেই পাওয়া যাবে না।

আধুনিকতার খাতিরে বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবনযাপনের চিত্র। বদলে যাচ্ছে থাকার জায়গা, পোশাক-আশাক, যোগাযোগ ব্যবস্থা। বদলে যাচ্ছে মওলাবকসের মতো শতশত মানুষের কর্মব্যস্ততা। ঠিক তেমনি আস্তে আস্তে নাই হয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এসব মাটির ঘর।

You May Also Like